গাইঘাটা: একাদশ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। তদন্তের স্বার্থে সোমবার গভীর রাতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাস্থলে। অপরাধের পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার পথেই ঘটে গেল রক্তাক্ত ঘটনা। পুলিশের দাবি, কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাস। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। সেই গুলিতেই মৃত্যু হয় তাঁর। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের নিরাপত্তা এবং হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের কাছ থেকে কী ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হল, তা নিয়ে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার রাত ১২টার কিছু আগে গাইঘাটায় ওই কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রহ্লাদকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তের প্রয়োজনেই ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছিলেন তদন্তকারীরা। সেই পর্ব শেষে পুলিশকর্মীরা তাঁকে নিয়ে ফিরছিলেন। অভিযোগ, ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে প্রস্রাব করার জন্য গাড়ি থামাতে বলেন প্রহ্লাদ। এর পরেই আচমকা এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেন তিনি।
পুলিশের দাবি, বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার পর পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালান প্রহ্লাদ।
তার মধ্যে একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে। আচমকা এই হামলায় বিপাকে পড়েন কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা। তাঁদের মধ্যে এক জন আত্মরক্ষার জন্য রাস্তার পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন বলে জানা গিয়েছে। হামলায় এক পুলিশকর্মী জখমও হন বলে প্রাথমিক ভাবে খবর। এর পরেই পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। সূত্রের দাবি, আত্মরক্ষার্থে চার রাউন্ড গুলি চালান পুলিশকর্মীরা। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে প্রহ্লাদের গায়ে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে দ্রুত চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। জখম পুলিশকর্মীরও হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে পুলিশ। বৈদ্যবাড়ি এলাকায় রাস্তার একটি অংশ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। ঘটনাস্থলে একটি জুতো পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেটি কার, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি, মৃত অভিযুক্তের বাড়ি এবং ওই কিশোরীর বাড়ির দিকেও বহিরাগতদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঘটনার পর এলাকায় যাতে নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়, সে জন্য পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে কী ভাবে পুলিশি হেফাজতে থাকা এক অভিযুক্ত কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন, সেই প্রশ্নও উঠছে। কী পরিস্থিতিতে বন্দুকটি তাঁর নাগালে চলে এল, নিরাপত্তারক্ষীদের অবস্থান কোথায় ছিল এবং গুলি চালানোর ঠিক আগে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। সোমবার রাতের এই ঘটনা নিয়ে পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে বিস্তারিত বিবৃতি দেয়নি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং গুলিচালনার পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
কী ঘটেছিল কিশোরীর সঙ্গে?
গাইঘাটা থানা এলাকার ১৭ বছর বয়সি ওই কিশোরী একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত শনিবার রাতে বাড়ির কাছেই একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল সে। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুবান্ধবরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের দাবি, রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ কিশোরীর মোবাইলে একটি ফোন আসে। ফোন পাওয়ার পরেই জলসার অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায় সে। তার পর আর বাড়ি ফেরেনি।
রাত গভীর হলেও মেয়ের খোঁজ না মেলায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিন্তু রাতভর খুঁজেও তার সন্ধান মেলেনি। রবিবার সকালে প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন দিক থেকে কিশোরীর বিবস্ত্র ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। দেহের অবস্থা দেখে ধর্ষণ ও খুনের সন্দেহ তৈরি হয়। পরিবারের তরফেও ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ তোলা হয়।
ঘটনার তদন্তে নেমে রবিবারই প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি কিশোরীর পরিবারের আত্মীয় বলে জানা গিয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা জানার চেষ্টা করছিলেন তদন্তকারীরা। কী কারণে এই ঘটনা ঘটল, তা নিয়েও তদন্ত চলছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরীর সঙ্গে অভিযুক্তের পরিবারের কোনও বিরোধ বা আক্রোশের বিষয় সামনে এসেছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তবে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য তদন্ত প্রয়োজন।
এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া, খুশি নির্যাতিতার পরিবারও
প্রহ্লাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গাইঘাটার বাসিন্দাদের একাংশ সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, একাদশ শ্রেণির ছাত্রীর এমন মর্মান্তিক পরিণতির পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল। পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন কিশোরীর পরিবারের সদস্যেরাও। নিহত কিশোরীর বাবার কথায়, মেয়েকে আর ফিরে পাবেন না তিনি। তবে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
তাঁর দাবি, পুলিশের পাল্টা গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, এমন অপরাধের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন। তাঁদের মতে, এই ঘটনা অন্যদের কাছে সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। তবে অভিযুক্তের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধের তদন্তের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলেছে, এমন নয়। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ এবং পুলিশের গুলিচালনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা জরুরি।
বারুইপুরের ঘটনার ছায়া গাইঘাটায়
গাইঘাটার এই ঘটনা কয়েক মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্তের পুলিশি গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাকেও মনে করিয়ে দিয়েছে। সে ক্ষেত্রেও অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, তিনি পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পরে পুলিশের পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ বার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় প্রায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় পুলিশি হেফাজতে অভিযুক্তদের নিরাপত্তা এবং অপরাধের পুনর্নির্মাণের সময় অনুসরণ করা নিয়ম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গাইঘাটার ঘটনায় এক কিশোরীর মৃত্যু ঘিরে যে তদন্ত শুরু হয়েছিল, অভিযুক্তের মৃত্যুর পর তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি হল। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল সেই রাতে, কী ভাবে পুলিশের বন্দুক অভিযুক্তের হাতে গেল এবং গুলিচালনার পরিস্থিতি কী ছিল—সেই প্রশ্নগুলির নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে তদন্তের ফলের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।




