নিউজ ডেস্ক: লক্ষ্মীসরা ও দেশভাগের সম্পর্ক মূলত ছিন্নমূল মানুষের শিকড় আঁকড়ে ধরার আকুলতা, স্মৃতিকাতরতা এবং লোকশিল্পের ভৌগোলিক স্থানান্তরের এক মর্মস্পর্শী ইতিহাস।
বাঙালির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় মাটির সরায় আঁকা দেবীর আরাধনা করার এই বিশেষ ঐতিহ্যটি মূলত ওপার বাংলা বা পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) নিজস্ব সংস্কৃতি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের কারণে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে এপার বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) চলে আসতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের হাত ধরেই এই লৌকিক প্রথাটি পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আসা ভিটেহারা মানুষগুলো যখন এপার বাংলায় নতুন করে জীবনসংগ্রাম শুরু করেন, তখন তাঁদের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে প্রধান মানসিক অবলম্বন। পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দারা যেখানে মাটির বা পিতলের মূর্তিতে লক্ষ্মীপুজো করতেন, সেখানে পূর্ববঙ্গের মানুষেরা নিজেদের শিকড়ের টান ও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরা পুজোকেই আঁকড়ে ধরেন।
দেশভাগের সময় লক্ষ্মীসরা তৈরি করা শিল্পীরা (ফরিদপুর ও ঢাকা অঞ্চলের কুম্ভকার ও মালাকার সম্প্রদায়ের সদস্যরা) এপারে চলে আসেন। তাঁরা নদিয়ার তাহেরপুর, নবদ্বীপ এবং উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন কলোনি ও এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। জীবিকার তাগিদে এবং ওপার বাংলার মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তাঁরা এপার বাংলাতেও সরা তৈরি ও সরায় চিত্রাঙ্কন শুরু করেন, যার ফলে এই মৃৎশিল্পটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়।
স্বপন ঠাকুরের ‘কৌলাল’ পত্রিকা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে কোজাগরী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই ফরিদপুর ও ঢাকা অঞ্চলে লক্ষ্মীসরার উৎপত্তি ঘটে। বিভিন্ন অঞ্চলের সরার বৈচিত্র্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত দেশভাগের স্মৃতির সঙ্গে। ওপার বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সরা আঁকার শৈলী ছিল আলাদা। যেমন, ফরিদপুরের সুরেশ্বর অঞ্চলের সুরেশ্বরী সরায় উপরে শিব, মাঝখানে সপরিবারে দুর্গা এবং নিচে লক্ষ্মী থাকেন। আবার, ফরিদপুরি সরা সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত থাকে এবং দেবদেবীরা এতে চৌখুপির মধ্যে অবস্থান করেন। ঢাকাই সরায় নারায়ণ ও লক্ষ্মীকে পরস্পরের মুখোমুখি দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায়। গণকা সরা হলো লাল পটভূমির ওপর গণক ঠাকুরদের আঁকা এক ধরনের সরা। এই সরাকে হিন্দু সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষের ব্যবহৃত লক্ষ্মীর পট বলা হয়। এই সরার প্রধান দেবীমূর্তি হলেন দুর্গা ও তাঁর পরিবার। নিচের অংশে থাকেন লক্ষ্মী ও তাঁর বাহন পেঁচা।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে লক্ষ্মীপুজো সম্পর্কে লেখেন, দেবীর কাছে ক্ষেতের ভালো ফলনের কামনা করাই আসলে এই পুজোর নৃতাত্ত্বিক কারণ। কথিত আছে, কোজাগরী লক্ষ্মী কাঁসর-ঘণ্টা ও ষোড়শোপচার পছন্দ করেন না। তিনি সংসারী মানুষের শান্ত ঘরে ও হৃদয়কমলেই থাকতে চান। তাঁর পুজোর জন্য সংস্কৃত মন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় না পুরুষ পুরোহিতেরও। তিনি শুধু ধনসম্পদই দান করেন না, খ্যাতি, সাহস, শক্তি, জয়, সুখ ও সৌন্দর্যও প্রদান করেন। তাই তাঁর পুজো উপলক্ষেই বাঙালি তৈরি করেছিলেন মাটির সরা। সেই সরার গায়ে আঁকা থাকে লক্ষ্মী, পেঁচা, নারায়ণ, কড়ি ও ধানের শিষের ছবি।
আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীসরার যে বিপুল প্রচলন দেখা যায়, তা আসলে দেশভাগের এক ঐতিহাসিক দলিল। ফেলে আসা ভিটেমাটির সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনার যে প্রার্থনা ওপার বাংলার মানুষ সরা পুজোর মাধ্যমে করতেন, তা আজও এপার বাংলার প্রতিটি কোজাগরীর রাতে এক দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন হয়ে বেঁচে রয়েছে।




