নিউজ ডেস্ক: কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হোক কিংবা প্রতি সপ্তাহের লক্ষ্মী আরাধনা, বাঙালি হিন্দু পরিবারে বাড়ির মেঝেতে আলপনা আঁকার রীতি বহুদিনের। আর সেই আলপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। সাধারণত চালের গুঁড়ো, আতপ চালের গোলা বা খড়ি দিয়ে বাড়ির প্রবেশপথ থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত আঁকা হয় দেবীর চরণচিহ্ন। কিন্তু কেন এই রীতি? এর পিছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, দেবীর প্রতীকী উপস্থিতি এবং বাংলার লোকাচারের দীর্ঘ ইতিহাস।
দেবীর আগমন ও শুভ শক্তির প্রতীক
হিন্দুধর্মে দেবী লক্ষ্মীকে ধন, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও শস্যসমৃদ্ধির দেবী হিসেবে আরাধনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুজোর রাতে দেবী ভক্তদের গৃহে আগমন করেন এবং তাঁদের সুখ-সমৃদ্ধির আশীর্বাদ দেন। সেই বিশ্বাস থেকেই বাড়ির প্রবেশপথে তাঁর পায়ের ছাপ আঁকার রীতি প্রচলিত হয়েছে। প্রতীকীভাবে এই চরণচিহ্ন দেবীকে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোরই প্রকাশ।
কেন প্রবেশপথ থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত আঁকা হয়?
বাংলার বহু পরিবারে দরজা, উঠোন কিংবা বাড়ির ভিতর থেকে পুজোর স্থান পর্যন্ত লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয়। সাধারণত এমনভাবে চিহ্নগুলি সাজানো হয়, যাতে মনে হয় দেবী বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছেন। এই নকশা শুধুমাত্র সাজসজ্জা নয়, বরং দেবীর শুভ উপস্থিতি ও গৃহে সমৃদ্ধির কামনার প্রতীক। তবে পায়ের ছাপ কোথায় এবং কীভাবে আঁকা হবে, তা পরিবার ও অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে।
আলপনায় চালের গুঁড়ো ব্যবহারের তাৎপর্য কী?
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলার আলপনা আঁকার জন্য চালের গুঁড়ো বা আতপ চালের গোলা ব্যবহার করা হয়। চাল ও ধান বাংলার কৃষিজীবন, অন্ন এবং শস্যের প্রাচুর্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে শস্যসমৃদ্ধির সম্পর্ক থাকায় লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় ধানের শিষ ও চরণচিহ্নের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই নকশাগুলির মাধ্যমে সংসারে অন্নের অভাব দূর হওয়া এবং সুখ-সমৃদ্ধি বজায় থাকার কামনা প্রকাশ পায়।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের মেলবন্ধন
লক্ষ্মীপুজোয় দেবীর আরাধনা ধর্মীয় আচার হলেও, বাড়ির মেঝেতে চরণচিহ্ন আঁকার নির্দিষ্ট নকশা ও পদ্ধতির মধ্যে বাংলার লোকসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকাকে কোনও একটিমাত্র শাস্ত্রবিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি দেবীর প্রতি ভক্তি, মঙ্গলকামনা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা কেবল একটি আচার নয়। এর মধ্যে রয়েছে দেবীকে ঘরে স্বাগত জানানোর ভাবনা, অন্ন ও সমৃদ্ধির কামনা এবং বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতির পরিচয়।




