কলকাতা: মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিশ্রুতির শেষ নেই। নারী-সুরক্ষা নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজাও চলে নিয়মিত। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদেরই একাংশের নির্বাচনী হলফনামায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা থাকার তথ্য উঠে এলে প্রশ্ন উঠবেই। সেই প্রশ্ন আরও জোরালো করল এডিআর এবং ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচের সাম্প্রতিক রিপোর্ট। দেশের ১৮৭ জন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়ক তাঁদের নির্বাচনী হলফনামায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা থাকার কথা ঘোষণা করেছেন। রাজ্যভিত্তিক তালিকায় সবচেয়ে উপরে পশ্চিমবঙ্গ। এই রাজ্যের ৬৯ জন সাংসদ ও বিধায়কের হলফনামায় এমন মামলার উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। সে রাজ্যের ২২ জন সাংসদ ও বিধায়কের বিরুদ্ধে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা থাকার কথা হলফনামায় ঘোষণা করা হয়েছে। তৃতীয় স্থানে ওড়িশা, সেখানে এই সংখ্যা ১৭। সংখ্যার এই তালিকা রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী বাছাই এবং অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি করেছে।
৪,৮৮১টি হলফনামা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট
এডিআর এবং ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ গত পাঁচ বছরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কদের হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে। মোট ৪,৮৯৯টি নির্বাচনী হলফনামার মধ্যে ৪,৮৮১টি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭২ জন বর্তমান সাংসদ এবং ৪,১০৯ জন বর্তমান বিধায়কের হলফনামা রয়েছে। উপনির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হলফনামাও বিশ্লেষণের আওতায় এসেছে।
এই বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ১৮৭ জন জনপ্রতিনিধি মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা থাকার কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৯ জন সাংসদ এবং ১৬৮ জন বিধায়ক। তবে এডিআরের রিপোর্টে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া হলফনামায় থাকা মামলাগুলির বর্তমান অবস্থা সব ক্ষেত্রে জানা নেই। কোনও কোনও মামলায় পরবর্তী সময়ে তদন্ত, বিচার বা অন্য আইনি পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি বদলে গিয়ে থাকতে পারে। সেই কারণে এই পরিসংখ্যানকে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার তালিকা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা যে মামলাগুলির কথা ঘোষণা করেছেন, তারই হিসাব এটি।
ধর্ষণের মামলাও রয়েছে ১৪ জনের বিরুদ্ধে
রিপোর্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হল, ১৪ জন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কের হলফনামায় ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন লোকসভার সাংসদ এবং ১২ জন বিধায়ক। দলভিত্তিক হিসাবেও উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিজেপির চার জন জনপ্রতিনিধির হলফনামায় ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার উল্লেখ রয়েছে—দু’জন সাংসদ ও দু’জন বিধায়ক। কংগ্রেসের চার জন বিধায়কের বিরুদ্ধেও এমন মামলার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া তেলুগু দেশম পার্টি, ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস, বিজু জনতা দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ভারত আদিবাসী পার্টি এবং অল ইন্ডিয়া সেকুলার ফ্রন্টের এক জন করে বিধায়কের হলফনামায় ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার উল্লেখ রয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্ষণ ছাড়াও মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শ্লীলতাহানি, যৌন হেনস্থা, অপহরণ, বিয়েতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে হুমকি এবং মহিলাদের অনুসরণ করে হয়রানি করার মতো অভিযোগ।
দলভিত্তিক তালিকায় বিজেপি শীর্ষে
দেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা থাকা জনপ্রতিনিধির সংখ্যায় প্রথম স্থানে রয়েছে বিজেপি। দলের ১০৬ জন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কের হলফনামায় এমন মামলার উল্লেখ রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেস, তাদের ২০ জন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এই ধরনের মামলা থাকার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে তেলুগু দেশম পার্টি—১৮ জন জনপ্রতিনিধির হলফনামায় এমন মামলার উল্লেখ রয়েছে।
তবে শুধু মোট সংখ্যা দিয়ে কোনও দলের সামগ্রিক অবস্থান বিচার করলে ছবির একটি অংশই দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট দলের মোট সাংসদ ও বিধায়কের সংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে চিত্র কিছুটা বদলে যায়। এডিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দলের মোট জনপ্রতিনিধির তুলনায় এমন মামলার অনুপাত তেলুগু দেশম পার্টির ক্ষেত্রে ১১.৬ শতাংশ, বিজেপির ক্ষেত্রে ৪.৯ শতাংশ এবং কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ২.৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, মোট সংখ্যার পাশাপাশি অনুপাত বিচার করাও জরুরি। একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, মামলার অভিযোগের প্রকৃতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং বিচারাধীন অবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই পরিসংখ্যানের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা করতে হলে সেই আইনি প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলার ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও তীব্র
রাজ্যভিত্তিক তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষে থাকা স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন উপাদান হয়ে উঠতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলার ৬৯ জন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়কের হলফনামায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৩ জন বিধায়ক, চার জন লোকসভার সাংসদ এবং দু’জন রাজ্যসভার সাংসদ।
এই তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। ফলে বিষয়টিকে কোনও একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক দলগুলির জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে দলগুলি কী ধরনের যাচাই করে এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ভোটারদের কতটা স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়—সেই প্রশ্নগুলিই সামনে আসছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, তবু প্রশ্ন প্রার্থী বাছাইয়ে
অপরাধের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং তাঁদের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ নিয়ে আগেও একাধিক বার বিতর্ক হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক দলগুলিকে অপরাধের পূর্ব ইতিহাস থাকা প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার কারণ প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছিল। এডিআরের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে।
এডিআর সুপারিশ করেছে, অপরাধের ইতিহাস থাকা প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের স্থায়ী ভাবে নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি। গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্তদের মন্ত্রিসভায় নিয়োগ না করার পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার মতো পদক্ষেপের সুপারিশও করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে আইনগত ও সাংবিধানিক দিকগুলি বিবেচনা করা জরুরি। অভিযোগ, বিচারাধীন মামলা এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া—এই তিনটি বিষয় এক নয়। একই সঙ্গে গুরুতর অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, এডিআরের রিপোর্ট জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষত নারী-নিরাপত্তা যখন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হতে পারে। মামলা মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়, কিন্তু গুরুতর অভিযোগের তথ্য ভোটারদের সামনে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা এবং তার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা—দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।




