ওয়াশিংটন: ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ থামানোর কৃতিত্ব ফের নিজের ঝুলিতে ভরলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বার মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারমঞ্চে উঠে এল ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, ভারত ও পাকিস্তানের উপর ২৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েই দুই দেশকে সংঘর্ষ থামাতে বাধ্য করেছিলেন তিনি। যদিও ট্রাম্পের এই দাবি আগেই একাধিক বার খারিজ করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়েছিল দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে। সেখানে কোনও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছিল না।
ফ্লরিডায় এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ যখন ভয়াবহ আকার নিচ্ছিল, তখন দুই দেশকেই কড়া বাণিজ্যিক হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি। সংঘর্ষ বন্ধ না করলে বিপুল পরিমাণ শুল্ক চাপানো হবে বলে জানানো হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, সেই চাপের মুখেই সংঘর্ষ থামাতে রাজি হয় দুই দেশ। ট্রাম্পের বক্তব্য, ভারত ও পাকিস্তানকে তিনি বুঝিয়েছিলেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাঁর দাবি, ২৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দুই দেশের উপর চাপ তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই চাপেই গোলাগুলি বন্ধ হয়।
ভারত-পাক সংঘর্ষ থামানোর কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করা অবশ্য ট্রাম্পের কাছে নতুন নয়। গত বছর থেকেই একাধিক বার তিনি দাবি করেছেন, বাণিজ্যিক চাপ এবং ব্যক্তিগত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছিলেন। কখনও একাধিক যুদ্ধ থামানোর প্রসঙ্গে, কখনও নিজের প্রশাসনের সাফল্যের তালিকা তুলে ধরতে গিয়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের উল্লেখ করেছেন তিনি।
এ বারের বক্তব্যেও নিজের কূটনৈতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একাধিক সংঘাত থামানোর দাবি করে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্য, বিভিন্ন যুদ্ধের অবসানে ভূমিকা রাখার পরেও তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল দেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলায় একাধিক মানুষের মৃত্যুর পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এর জবাবে ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে ভারত। পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি পরিকাঠামো ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এর পর দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ তীব্র হয়।
১০ মে সংঘর্ষ থামানোর বিষয়ে সমঝোতার কথা সামনে আসে। ভারতের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের তরফে যোগাযোগের পর দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত হয়। ভারত বার বার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে আমেরিকার কোনও মধ্যস্থতা ছিল না। ট্রাম্পের দাবি এবং ভারতের বক্তব্যের মধ্যে এই ফারাকই নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। এক দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট শুল্কের হুমকিকে সংঘর্ষ থামানোর প্রধান হাতিয়ার বলে তুলে ধরছেন, অন্য দিকে দিল্লি সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। ভারতের অবস্থান, সামরিক সংঘর্ষ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল দুই দেশের নিজস্ব যোগাযোগের মাধ্যমেই।
ট্রাম্পের বক্তব্যে সংঘর্ষের সময় বিমানক্ষতির প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তবে যুদ্ধ চলাকালীন কতগুলি বিমান ভূপাতিত হয়েছিল, তা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে নিজের প্রশাসনের কূটনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে চাইছেন তিনি। সেই প্রচারের অংশ হিসেবেই ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ থামানোর দাবি আবার সামনে এনেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, অপারেশন সিঁদুরের পর সংঘর্ষ থামানোর কৃতিত্ব নিয়ে ট্রাম্পের দাবি ও ভারতের সরকারি অবস্থানের ফারাক ফের প্রকাশ্যে এল। ট্রাম্পের বক্তব্য, ২৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকিই দুই দেশকে থামিয়েছিল। কিন্তু নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে কোনও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছিল না।




