নিউজ ডেস্ক: একজটা (বা একজটা তারা) হলেন হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় তান্ত্রিক পরম্পরাতেই পূজিত এক অত্যন্ত উগ্র ও শক্তিশালী দেবীমূর্তি। সনাতন শাক্ত ঐতিহ্যে তিনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় দেবী তারা-র অন্যতম প্রধান রূপ (উগ্রতারা, একজটা ও নীলসরস্বতী—এই তিন রূপের একটি)।
দেবীর নামের মূল কারণ তাঁর মস্তকে থাকা একক পিঙ্গল বা কৃষ্ণবর্ণের জটাকলাপ, যা ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় থাকে। দর্শনে এটি অদ্বৈত চেতনা বা একক লক্ষ্যের প্রতীক।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য: তিনি সাধারণত খর্বাকৃতি, লম্বোদরী (উন্নত উদরযুক্ত) এবং ঘন নীল বা কৃষ্ণবর্ণা। তাঁর মুখমণ্ডল ভয়াল, ত্রিনয়ন বিশিষ্ট, দন্ত বিকট এবং জিহ্বা প্রসারিত।
আয়ুধ ও অলঙ্কার: তাঁর হাতে থাকে খড়্গ (জ্ঞান বা অজ্ঞানতা বিনাশের প্রতীক), নরকরোটি বা কপালপাত্র, নীলপদ্ম এবং কখনো কখনো কর্তরী বা ত্রিশূল।
তিনি মুণ্ডমালা ও সর্পালঙ্কারে ভূষিত এবং বাঘছাল পরিধান করেন।
আসন: তিনি শব বা শিবের বক্ষে এক পা বা দ্বি-পা রেখে প্রত্যালীঢ় ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান থাকেন, যা প্রকৃতির ওপর চৈতন্যের স্থিতি নির্দেশ করে।
তন্ত্রের এই ভয়ঙ্কর দেবীকে গৃহে রেখে পুজো করার সাহস কোনো ভক্তের হয় না। তিনি মূলত নিভৃত মহাশ্মশান, তান্ত্রিক পীঠস্থান এবং বৌদ্ধ গুহা বা মনাস্ট্রিতে দীক্ষিত সাধকদের মাধ্যমেই পূজিত হন।
এখন দেখার বিষয় এটাই এই এক জটা তাঁরাই কিন্তু তন্ত্র গ্রাম বেলপুকুর গ্রামের সাধক রামচন্দ্র ভট্টাচার্যের বংশধরদের ইষ্ট দেবী। রামচন্দ্র ভট্টাচার্য বঙ্গ দেশের কনকসার গ্রাম থেকে রাজা রুদ্রের আমলে বেলপুকুর ( তখন বিল্ব পুষ্করিণী) তে এসে রাজ অনুগ্রহে নিষ্কর জমি পেয়ে পঞ্চ মুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধি লাভ করেন। ও গ্রামের ঘরে ঘরে তন্ত্র মতে কালী পুজোর প্রচলন করেন।
যে দেবীকে ঘরে রাখার সাহস কারো হয় না। তন্ত্র গ্রামে সেই দেবীই কিন্তু ঘরে স্থান পান। ইষ্ট দেবী হিসাবে ঘরের মেয়ের মত ই সাধকের সেবা পান। এ এক অদ্ভুত বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের আর কোথাও এমন সহজ ভাবে এক জটা তাঁরার ঘরের মেয়ে হয়ে থাকা দেখা যায় বলে আমার জানা নেই।
তন্ত্র সাধনায় "যন্ত্র" একটা বড় বিষয়।
তন্ত্র সাধনায় যন্ত্র, মন্ত্র এবং তন্ত্র—এই তিনটি অঙ্গ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। তন্ত্রশাস্ত্রে কথিত আছে:
“যন্ত্রং মন্ত্রময়ং প্রোক্তং মন্ত্রাত্মা দেবতৈব হি।”
অর্থাৎ, যন্ত্র হলো মন্ত্রের দৃশ্যমান রূপ এবং মন্ত্র হলো স্বয়ং দেবতার আত্মাস্বরূপ।
সনাতন হিন্দু ধর্মের দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় দেবী দেবী তারার শক্তি বা রূপকে প্রকাশ করার একটি পবিত্র জ্যামিতিক প্রতীক বা রূপরেখা।
তান্ত্রিক আরাধনায় প্রতিমার বদলে বা প্রতিমার সঙ্গে তামা, রুপো, সোনা বা ভোজপত্রে অঙ্কিত নির্দিষ্ট দেবতার যন্ত্র (যেমন—কালীযন্ত্র, তারাযন্ত্র বা শ্রীযন্ত্র) প্রতিষ্ঠা করে প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।
তন্ত্রে দীক্ষিত না হলে এই যন্ত্র দর্শন করা যায় না বলেই বিশ্বাস তন্ত্র সাধকদের।
তন্ত্র গ্রাম বেলপুকুরে রাম চন্দ্রের প্রধান বংশধরেরা বর্তমানে বড়, ন ও ছোট বাড়িতে বসবাস করছেন ( বড় বাড়ি এখন বড় ও মেজ দুটি বাড়িতে বিভক্ত)।
পারিবারিক ভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে সাধক রাম চন্দ্রের সাধনার "মহা শঙ্খের জপ মালা" ' ন ' বাড়ি পেয়েছেন। যা কালী পুজোর রাতে বের করা হয় বিশেষ তন্ত্রের পুজোর জন্য। "চণ্ডী" ও "কন্তেশ্বর শিব"পেয়েছেন ছোট বাড়ি। চণ্ডী মণ্ডপে অধিষ্ঠান করেন, কান্তেশর শিবকে সারা গ্রামে বিভিন্ন পুজো পার্বণে পূজার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। "যন্ত্র" তিনটি বাড়িতেই থাকে বিভিন্ন সময়ে পুজোর প্রয়োজনে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও তন্ত্র সাধনার নিয়মের কারণে ছবিতে তন্ত্র গ্রামের আসল যন্ত্রের ছবির নকশাটি ঝাপসা।




