নিউজ ডেস্ক: একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর সাফল্য, যা আসলে ভারতীয় বিজ্ঞানের এক গর্বের মুহূর্ত। ভারতীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক অশোক সেন ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ Oskar Klein Medal বা ‘অস্কার ক্লেইন পদক’ লাভ করেছেন। এই সম্মান পাওয়া প্রথম ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী তিনি। ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ এই খবর ঘোষণা করে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত International Centre for Theoretical Sciences (ICTS)। পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদক তাঁকে প্রদান করা হয়।
বিখ্যাত সুইডিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অস্কার ক্লেইনের নাম অনুসারে এই পদকের নামকরণ করা হয়েছে।১৯৮৮ সালে এই পুরস্কার চালু হয়। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্সের উদ্যোগে এই সম্মান প্রদান করা হয়। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী চেন-নিং ইয়াং, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং হান্স বেথে এই পদকের প্রথম তিন বছরের প্রাপক ছিলেন।
পদার্থবিদ অশোক সেনের আবিষ্কার ও গবেষণা আসলে কী? অধ্যাপক অশোক সেনের গবেষণার বিষয় অত্যন্ত গভীর। তবে সহজ ভাষায় বুঝতে চেষ্টা করা যাক, তাঁর কাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রিং থিওরি (String Theory) যা প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে। আমরা জানি, আমাদের চারপাশের জগৎ পরমাণু দিয়ে গঠিত। পরমাণুর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের মতো কণা। আবার প্রোটন ও নিউট্রনের ভিতরে রয়েছে আরও মৌলিক কণা। কিন্তু প্রকৃতির একেবারে গভীরে পদার্থের মৌলিক গঠন কেমন?স্ট্রিং থিওরি বা তারতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—প্রকৃতির কিছু মৌলিক উপাদানকে অতি ক্ষুদ্র কম্পনশীল তারের মতো বস্তু হিসেবে বর্ণনা করা যায়। এই তারগুলির বিভিন্ন কম্পন বিভিন্ন ধরনের কণার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারে।
এই তত্ত্বের লক্ষ্য হলো প্রকৃতির মৌলিক কণা ও বলগুলিকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বোঝা। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে বর্ণিত মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও স্ট্রিং থিওরি গুরুত্বপূর্ণ। তবে, স্ট্রিং থিওরি এখনও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রকৃতির চূড়ান্ত তত্ত্ব নয়। অধ্যাপক অশোক সেনের গবেষণা এই জটিল তত্ত্বের গাণিতিক কাঠামো ও বিভিন্ন ধারণাকে আরও গভীর এবং সুসংহত করতে সাহায্য করেছে।
একই প্রকৃতিকে বোঝার জন্য রয়েছে দুটি পথ! সহজভাবে দেখলে , একটি জটিল অঙ্ককে দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে সমাধান করা যায়। একটি পদ্ধতিতে অঙ্কটি কঠিন, কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে সেটি অনেক সহজ। পদার্থবিজ্ঞানের কিছু তত্ত্বেও এমন সম্পর্ক দেখা যায়। S-Duality হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সম্পর্ক, যেখানে কোনও তত্ত্বের প্রবল মিথস্ক্রিয়ার পরিস্থিতিকে অন্য একটি সম্পর্কিত তত্ত্বের দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার সাহায্যে বোঝা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, যে সমস্যার সমাধান একভাবে অত্যন্ত কঠিন, তার সমতুল্য অন্য একটি বর্ণনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। অশোক সেন স্ট্রিং থিওরিতে S-Duality-র ধারণা প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কঠিন সমস্যাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কখনও কখনও নতুন সমাধানের পথ খুলে যায়।
ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি (Black Hole Entropy): কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে কত তথ্য লুকিয়ে আছে?কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল এমন একটি মহাজাগতিক বস্তু, যার মহাকর্ষ এত প্রবল যে নির্দিষ্ট সীমার ভিতর থেকে আলোও বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের একটি গভীর বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এর সঙ্গে এনট্রপি বা এন্ট্রপি যুক্ত। তাপগতিবিদ্যায় এনট্রপি একটি ব্যবস্থার সম্ভাব্য মাইক্রোস্কোপিক অবস্থার সংখ্যা ও তার সঙ্গে যুক্ত তথ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। প্রশ্ন হলো, একটি ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি এত বেশি কেন? স্টিফেন হকিং ও জ্যাকব বেকেনস্টাইনের কাজ থেকে জানা যায়, ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি তার ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এই এনট্রপির পিছনে থাকা মৌলিক কোয়ান্টাম অবস্থাগুলি কী? অধ্যাপক অশোক সেন স্ট্রিং থিওরি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধরনের ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত কোয়ান্টাম অবস্থার সংখ্যা নির্ভুলভাবে গণনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বড় সাফল্য। এর মাধ্যমে মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং ব্ল্যাক হোলের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া আরও গভীর হয়েছে।
স্ট্রিং ফিল্ড থিওরি (String Field Theory) কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বে কণাকে ক্ষেত্রের উত্তেজিত অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। স্ট্রিং ফিল্ড থিওরি এই ধরনের ধারণাকে স্ট্রিং বা তারতত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। অধ্যাপক সেনের গবেষণা এই ক্ষেত্রের গাণিতিক কাঠামো ও স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অধ্যাপক অশোক সেনের গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ চোখে দেখা যায় না। কখনও একটি সমীকরণ, একটি গাণিতিক যুক্তি কিংবা একটি নতুন ধারণা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে।আজ যাঁরা স্কুলে বসে গণিতের অঙ্ক করছেন, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র বুঝতে চেষ্টা করছেন কিংবা মহাকাশ সম্পর্কে হাজারো প্রশ্ন করছেন, তাঁদের মধ্যেও আগামী দিনের বিজ্ঞানী, গবেষক ও আবিষ্কারক তৈরি হতে পারেন। বিজ্ঞানী হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ বড় কোনও পরীক্ষাগারে প্রবেশ করা নয়; প্রথম পদক্ষেপ হলো কৌতূহলী হওয়া, প্রশ্ন করা এবং উত্তর খোঁজা কখনও বন্ধ না করা। আজকের ছোট্ট প্রশ্নই আগামী দিনের বড় আবিষ্কারের সূচনা হতে পারে।




