অঙ্কন দাস: গণেশ- এমন একজন ভগবান যাকে প্রথমে পুজো না করলে, কোন পুজোতেই সিদ্ধিলাভ হয় না। দেখুন যদি খুব চিন্তা করে দেখা যায় ,তবে একটা জিনিস অবশ্যই লক্ষ্যণীয়- দেবভূমিতেও রাজনীতির বিভিন্ন দফতরের ভাগ আছে। এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীবিষ্ণু, প্রধানমন্ত্রী ব্রহ্মদেব এবং রাষ্ট্রপতি স্বয়ং শিব। আর এখান থেকেই মোড় ঘুরছে রাজনীতির। যেখানে রাষ্ট্রপতি পুত্র হয়েও গণেশ হয়ে উঠেছেন মানুষের ভগবান, অর্থাৎ জনগণের ভগবান। যাঁর আভিজাত্য এবং প্রাচুর্যের মধ্যে দিয়ে বড় হওয়ার কথা ছিল, তিনি জনসাধারণের মধ্যে মিশে গিয়েছেন। তিনি ঔদরিক, অর্থাৎ খেতে ভালোবাসেন। কিন্তু যখন কর্মের কথা আসে, তখন তার নাম উচ্চারিত হয় সিদ্ধিদাতা হিসেবে। তিনি যে কাজেই হাত দেন তাই হয়ে ওঠে সাফল্যমন্ডিত। আর ঠিক এই কারণেই তাকে- সকল দেবতার পুজোর আগে আবাহন করতে হয়,প্রণাম করতে হয়,তার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু ভগবান শিব,শ্রীবিষ্ণু অথবা ব্রহ্মদেবের মতন তাবড় তাবড় দেবতা থাকতে কেন একজন হস্তিমুখ ভগবানকে এই প্রথম পরিচয় হিসেবে বেছে নিতে হলো? আসুন জানা যাক।
দেখুন,গণেশ কিন্তু দেবী পার্বতীর গর্ভে আসা সন্তান,তথা দেবতা নন। তিনি পার্বতীর মানসজাত পুত্র। পার্বতীর মনের ইচ্ছা থেকে জন্ম গণেশের। এ কারণেই তার ওপর শুধুমাত্র পার্বতীরই বিশেষ স্নেহ মমতা এবং ভালোবাসার দাবি ছিল। আর এই স্নেহ মমতা এবং ভালোবাসা ঘিরেই ভগবান শিবের মনে জন্ম নেয় অসূয়া। আর তাই পার্বতীর স্নানের সময় দ্বাররক্ষক হিসেবে অধিষ্ঠিত গণেশকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বসেন শিব। কিন্তু গণেশ মা-ভক্ত। মায়ের আদেশ তার কাছে শিরোধার্য। তাই গণেশ কোনক্রমেই শিব কে পার্বতীর একান্ত মুহূর্তে সেখানে যেতে অনুমতি দেননি। অতএব, শিবের রাগ প্রকাশ পায়। সেই মুহূর্তেই গণেশের মাথা তিনি কেটে ফেলেন তার ত্রিশূল প্রয়োগ করে। পার্বতী ছুটে এসে এই ক্ষতি দেখে দুঃখে বিলাপ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে,উত্তর দিক থেকে সংগ্রহ করে আনা একটি শ্বেত হস্তির মাথা গণেশের ধড়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সেই থেকেই তিনি হস্তিমুখ। এই ঘটনার ক্ষতিপূরণ দেন শিব। নির্দেশ দেন- 'সকল দেবতার পুজোর আগে গণেশের পুজো হবে।'
এই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে 'সিঙ্গেল মাদার কনসেপ্ট' বা কোন মায়ের একাকী পথ চলা-এ প্রাচীন ভারতে প্রাচীন ইতিহাসে প্রাচীন সাহিত্যেও ছিল। আর তাই সিঙ্গেল মাদার হিসেবে,পার্বতী'র গণেশ কে গড়ে তোলা থেকে শুরু করে- তাকে বড় করে তোলা, সম্পূর্ণটাই একা হাতে করেছেন। আর তাই বিনায়ক হয়ে উঠেছেন পার্বতী নন্দন। শিব-নন্দন হিসেবে তিনি যতটা জনপ্রিয়,তার থেকেও বেশি তাকে আমরা চিনি এই নামেই। আর তাই মায়ের মতই গনেশ হয়ে উঠেছেন মানুষের কাছে ততধিক জনপ্রিয়। যতটা আশ্বিন মাসে চারটে দিন দুর্গা এই বাংলায় এলে-আমরা বুঝতে পারি দুর্গা কতটা আমাদের ঘরের মেয়ে!
এর পরের ঘটনা আরো চাঞ্চল্যকর। মহাভারত লেখার সময় শ্রী কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস আহ্বান করলেন সিদ্ধিদাতা গণেশকে। গণেশ সেই ডাকে সাড়া দিলেন। বেদব্যাসকে সাহায্য করার জন্যই তিনি হাতে কলম তুলে নিলেন। দেব-গনেশ ক্ষিপ্র লিপিকার হিসেবে দেব সমাজে বিশেষ পরিচিত। সময় এগোতে থাকলো। এগোতে থাকলো মহাকাব্য মহাভারত।গল্প থেকে গল্প, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গ, উদাহরণ থেকে নিদর্শন, নিদর্শন থেকে বংশপরম্পরার ঘটনা। উঠে এলো সবকিছুই। ঠিক এমন সময়ই দেব-গণেশের কলম স্খলিত হলো! কিন্তু লেখা তো থামানো যাবে না। তাই দেব গনেশ তার হস্তিমুখ থেকে একটি হস্তিদন্ত উপড়ে নিলেন। এবং তাই দিয়ে লেখা চালিয়ে যেতে লাগলেন!
এই যে তিনি হস্তিমুখ, এই যে তিনি একদন্ত , এই যে তিনি স্থূলোদর- আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি রোগ দিয়ে এই বৈশিষ্ট্য গুলিকে ডিকোড করি, তবে তা দাঁড়ায়- প্লাস্টিক সার্জারি, ডেন্টাল প্রবলেম, এবং ওবেসিটি। কিন্তু, কী এলো গেল তাতে? এত শারীরিক খুঁত নিয়েও গণেশ কিন্তু নিখুঁতভাবে কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। এই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই- 'বাধা আসুক,বিপদ আসুক, এমন কি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাতেও কখনোই যেন লক্ষ্যচ্যুত না হয়।' সবার আগে নিজের মন স্থির করে রাখলে কোন বাধাই বাধা থাকে না, তা মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায়! এই চিন্তাই যদি না থাকতো তবে গড়ে উঠত না অমর মহাকাব্য মহাভারত।
মজার কথার কী জানেন, গণেশ কে চতুর্ভুজ কেন বলা হয়েছে? আসলে চতুর্ভুজ তো কখনো কোন মানুষ হতে পারেন না। আর দেবতা কনসেপ্ট যদি আমরা ডিকোড করি,তবে আমরা এমন কোন মানুষের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাবো- যিনি আসলে একই সাথে চাররকম কাজ করার ক্ষমতা রাখেন। ঠিক যেমন গণনায়ক গণেশ। একটু বলা যাক। প্রথম কাজ ক্ষিপ্রতার। দ্বিতীয় কাজ সমস্ত কিছু খুব তলিয়ে দেখার ক্ষমতা এবং মুহূর্তেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। তৃতীয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ-যে কোন পরিস্থিতিতেই মাথা ঠান্ডা রেখে, পরিস্থিতিকে নিজের আওতায় নিয়ে আসা। চতুর্থটি হল- যেকোন বিপদে আপদে প্রয়োজনে নিজের সম্পূর্ণটুকু দিয়ে সেই বিপদ থেকে বাদবাকিদেরও রক্ষা করা আর এ কারণেই গণেশের অন্য নাম বিঘ্নবিনাশন।
গণেশের স্থূলোদর আসলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি,তথা দিন শেষে 'খাদ্যটুকু মিলে যাওয়াই আমজনতার পরম পাওয়া।' এটাই নির্দেশ করে। আবার অন্যদিকে এই স্থূলোদরই ভেঙে দিয়েছিল ধনগর্বে গর্বিত কুবেরের অহংকার! কুবেরের বাড়িতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়েছিলেন গণেশ। এবং একের পর এক খাদ্য নিঃশেষ করতে করতে, তিনি কুবের কে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ধন-মান কোন কিছুই কারো স্থায়ী নয়। তাই বিনয়ী থাকাটা সবথেকে বড় শিক্ষা। মানুষের মধ্যে থাকা, মানুষকে নিয়ে বাঁচা, সাধারণ হতে শেখা- সব থেকে বড় শিক্ষা। আবার এই গণেশ'ই তার বুদ্ধি চাতুর্যে মাত করে দেন দেবসেনাপতি কার্তিকের মতো তরুণ প্রজন্মের দেবতা কে। মা পার্বতী কে তিনবার তার চারিদিকে পাক খেয়ে এসে বলেন-'মায়ের মধ্যে স্বর্গ দেখতে পান মত দেখতে পান পাতাল দেখতে পান।' আর তাই তার তিন পাকেই তিন লোক দেখে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় তার বুদ্ধির সাথে বড় হয়ে ফুটে উঠেছে মাতৃভক্তি।
বাঙালি গনেশ পুজো করে মূলত তার ব্যবসা আরম্ভের সময়। নববর্ষের সময়। এছাড়াও ব্যবসা বা কর্মস্থলে গণেশের ছবি বা মূর্তি সাজিয়ে রাখে কর্মে সিদ্ধি পাওয়ার জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে যে ঘটনাটা আমরা দেখতে পাই তা হচ্ছে বাঙালির গণেশ জা বনাম অবাঙালির গণেশ পূজা। বারবার উঠে আসে তা প্রতিদ্বন্দিতা হিসেবে।কোথাও গিয়ে দেখনবাহার এবং প্রচারের নিদর্শন হিসেবে! যা আসলে গজারন হেরম্ব কোনদিনই চাননি তিনি চেয়েছেন তার পুজো সবার আগে হোক ঠিকই,কিন্তু তাকে নিয়ে যেন এত আড়ম্বর না করা হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষেরই ভগবান থাকতে চান। তাদের মতন সাধারণ থাকতেই ভালবাসেন। ঠিক একটি মাত্র মোদক ও লাল সিঁদুর অর্পনেই খুশি হন।