রথযাত্রা ও উল্টো রথের মধ্যবর্তী শনিবার বা মঙ্গলবার পালিত হয় বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় ধর্মীয় আচার বিপত্তারিণী ব্রত। সংসারের শান্তি, সন্তানের মঙ্গল এবং সকল বিপদ থেকে মুক্তির কামনায় এই ব্রত পালন করেন অসংখ্য ভক্ত, বিশেষ করে বাংলার মায়েরা। এই ব্রতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল দেবীকে তেরোটি ফল, তেরোটি ফুল এবং তেরো গিঁট দেওয়া পবিত্র সুতো নিবেদন করা।
অনেকের কাছে ‘তেরো’ সংখ্যাটি অশুভ বলে পরিচিত হলেও বাঙালি সংস্কৃতিতে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ প্রবাদই জানিয়ে দেয়, বাঙালির কাছে তেরো মানে উৎসব, প্রাচুর্য ও শুভতার প্রতীক। তাই বিপত্তারিণী ব্রতেও তেরো সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই আচার বহু প্রজন্ম ধরে বাংলার লোকঐতিহ্যের অংশ হয়ে রয়েছে।
ব্রতের দিন ভোর থেকেই মন্দির ও দেবীস্থানগুলিতে ভক্তদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। পূজার ডালিতে সাজানো থাকে মরশুমি দেশীয় ফল যেমন আম, কলা, কালোজাম, জামরুল, কাঁঠালের কোয়া, করমচা, তালশাঁস, গোলাপজাম, নোনা, বুনো খেজুর, আঁশফল, ফলসা, আতা কিংবা স্থানীয়ভাবে পাওয়া অন্যান্য ফল। কোথাও কোথাও ফলের প্রাপ্যতা অনুযায়ী শশা, তরমুজ বা পেঁপেও রাখা হয়।
ফুলের মধ্যেও থাকে দেশীয় বৈচিত্র্য। জবা, বেল, জুঁই, টগর, পদ্ম, অতসী, মালতী, স্বর্ণচাঁপা, শ্বেতচাঁপা, কাঠচাঁপা, কাঁঠালী চাঁপা, কল্কে, নীলকণ্ঠের মতো তেরো রকমের ফুল দেবীর চরণে নিবেদন করা হয়। পাশাপাশি তেল, সিঁদুর, দূর্বা ও তেরো গিঁটের হলুদ সুতোও পূজার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এই ব্রতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যচেতনার বার্তাও। বিভিন্ন ধরনের দেশীয় ফল একসঙ্গে ব্যবহারের মাধ্যমে পুষ্টিকর খাদ্যের গুরুত্ব যেমন উঠে আসে, তেমনি গ্রামবাংলায় নানা প্রজাতির ফলগাছ সংরক্ষণ ও রোপণের সংস্কৃতিকেও উৎসাহিত করে এই প্রথা। তাই বিপত্তারিণী ব্রত কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতি, পরিবেশ সচেতনতা ও পারিবারিক ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক।
আজও বাংলার গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র নিষ্ঠা, ভক্তি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পালিত হয় এই ব্রত। দেবী বিপত্তারিণীর আশীর্বাদে সংসারের সকল অশুভ শক্তি দূর হোক এবং সকলের জীবনে শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নেমে আসুক এই প্রার্থনাই করেন ভক্তরা।