ভারতবর্ষের সভ্যতার ইতিহাস কেবল নগর, রাজপ্রাসাদ কিংবা রাজদণ্ডের ইতিহাস নয়, এই ভূখণ্ডের প্রকৃত স্মৃতি বহুদিন ধরে লুকিয়ে আছে অরণ্যের নিস্তব্ধতায়, পর্বতের গহিন উপত্যকায়, নদীর বাঁকে, আর বনবাসী জনজাতির মুখে মুখে ফিরে-ফিরে আসা অসংখ্য লোককথার অন্তঃসলিলে। সেই বিস্মৃত অথচ অনিঃশেষ স্মৃতির অন্যতম দীপ্তিমান নাম রামের কথা।
শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে বনবাসী, গিরিবাসী ও প্রান্তিক জনসমাজের সম্পর্ক কোনও আকস্মিক উপাখ্যান নয়; রামায়ণের অন্তঃস্থলে সেই সম্পর্ক এক গভীর সাংস্কৃতিক সত্যের মতোই প্রবাহিত। অরণ্যবাসের দীর্ঘ পর্বে শ্রীরাম যে মানুষগুলির সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও করুণার, কখনও বন্ধুত্বের, কখনও আত্মীয়তার। রাজমুকুটের ঔজ্জ্বল্য থেকে বহু দূরে, অরণ্যের ধূলিধূসর পথে রামের মানবিকতার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তার অভিঘাত ভারতীয় লোকস্মৃতিতে আজও অম্লান।
এই প্রসঙ্গে কৃত্তিবাসী রামায়ণের কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়। কৃত্তিবাস কেবল সংস্কৃত রামায়ণকে বাংলায় অনুবাদ করেননি; তাঁর রচনায় রামকথা প্রবেশ করেছে বাংলার মাটি, মানুষের ভাষা এবং লোকজ অনুভূতির গভীরে। তাই তাঁর রামায়ণে প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি নিছক পার্শ্বচরিত্রের উপস্থিতি নয়, কখনও কখনও তারাই হয়ে উঠেছে মানবিকতার প্রধান আলোকবর্তিকা।
মহাশ্বেতা দেবী একদা লিখেছিলেন, কৃত্তিবাসের রামায়ণে আলাদা করে কোনও অন্ত্যজ-ভাবনা থাকা সম্ভব নয়; তিনি মূলত সংস্কৃত রামায়ণকে অসামান্য ভাষা ও ছন্দে বাংলায় রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃত্তিবাসের পংক্তির দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি তাঁর রামায়ণে প্রান্তিক মানুষের জন্য কোনও স্বতন্ত্র মানবিক উচ্চারণ নেই?
চণ্ডাল গুহকের সঙ্গে শ্রীরামের সখ্যতার প্রসঙ্গটিই যথেষ্ট। সামাজিক পরিচয়ের প্রচলিত সীমানাকে অতিক্রম করে রাম সেখানে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। কৃত্তিবাসের ভাষায় সেই মানবিকতার উচ্চারণ,
“চণ্ডাল বলিয়া যদি ঘৃণা কর মনে
পতিত পাবন নাম তবে কি কারণে।”
এই দুটি পংক্তি শুধু ধর্মীয় ভক্তির আবেগ নয়; সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক গভীর মানবিক প্রশ্নও বটে। যে মানুষকে সমাজ ‘চণ্ডাল’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, তার মধ্যেই যদি ঈশ্বরের স্পর্শ অনুভূত হয়, তবে জাতিভেদের অহংকারের ভিত্তিটিই বা কোথায়?
শ্রীরামের সুগ্রীবের সঙ্গে বন্ধুত্ব, বানরকুলের সঙ্গে তাঁর নিবিড় আত্মীয়তা, কিংবা শবরীর অর্পিত ফল গ্রহণ, প্রতিটি পর্ব যেন ভারতীয় আখ্যানের অন্তঃসলিলে বহমান এক বৃহত্তর মানবতাবাদের প্রতীক। শবরীর ফলের মাধুর্য তার স্বাদে যত না, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তার অর্পণের নির্মলতায়। শ্রীরাম সেই অর্পণ গ্রহণ করেন; গ্রহণ করেন মানুষের হৃদয়, তার সামাজিক পরিচয় নয়।
রামকথার এই স্রোত কেবল শাস্ত্রীয় সাহিত্যের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ থাকেনি। তার শিকড় বহু গভীরে, বনবাসী কৌমসমাজের লোকস্মৃতির মাটিতেও। বিরহড় সমাজে প্রচলিত ‘রাম-সীতা-হনুমান’ লোককথা তার এক আশ্চর্য দৃষ্টান্ত।
সেই লোককথায় রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা অরণ্যে যাযাবর জীবনের মতো দিন কাটান। তেঁতুলগাছের বিশাল পাতার নীচে আশ্রয় নিয়ে রাম লক্ষ্মণকে বলেন, বনবাসের অর্থ তো কষ্টকে গ্রহণ করা; এমন আরাম কেন, যেখানে রৌদ্র-বৃষ্টি শরীরে এসে পৌঁছয় না? লক্ষ্মণের তীরে তেঁতুলপাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। লোকবিশ্বাসে সেই থেকেই তেঁতুলের পাতা ছোট ছোট। পরে খেজুরপাতার অতিরিক্ত বিস্তারও লক্ষ্মণের তীরেই সরু হয়ে যায়, অরণ্যের উদ্ভিদজগতের বৈশিষ্ট্যও সেখানে রামকথার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
এখানেই রামায়ণের এক বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তি ধরা পড়ে। গ্রন্থের অক্ষর যেখানে শেষ, লোকস্মৃতির শুরু সেখানেই। বনবাসী মানুষের কাছে রাম কোনও দূরবর্তী রাজপুরুষ নন; তিনি তাঁদের অরণ্যের পথের সহযাত্রী, তাঁদের জীবনযাত্রার অংশ, তাঁদের গাছপালা, নদী, পাহাড় ও কুঁড়েঘরের স্মৃতিতে মিশে থাকা এক আত্মীয় চরিত্র।
৯ আগস্ট, বিশ্ব আদিবাসী দিবস তাই কেবল জনজাতির অধিকার, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের কথা স্মরণ করার দিন নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতার সেই বহুস্বরিক স্মৃতিকে পুনরায় আবিষ্কারেরও দিন। যে অরণ্যকে আমরা প্রান্তর বলে দেখি, তারও নিজস্ব ইতিহাস আছে; যে লোককথাকে আমরা নিছক কল্পকাহিনি বলে পাশ কাটাই, তার ভিতরেও বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক স্মৃতি সুপ্ত থাকে।
ভারতবর্ষের ঐতিহ্য একরৈখিক নয়, তার শিকড় বহুমুখী, তার স্মৃতি বহুস্বরিক। রামকথা সেই বহুস্বরের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি। রাজসভা থেকে অরণ্য, সংস্কৃত মহাকাব্য থেকে লোকভাষা, শাস্ত্রের পৃষ্ঠা থেকে বনবাসী মানুষের মুখ, সবখানেই তার বিচরণ।
তাই অরণ্যের মানুষের রামকথা কেবল রামায়ণের পুনর্কথন নয়; তা ভারতীয় সভ্যতার এক গভীর অন্তঃস্মৃতি, যেখানে মানুষকে তার পরিচয়ে নয়, তার হৃদয়ে চিনে নেওয়ার এক প্রাচীন আহ্বান আজও ধ্বনিত হয়ে চলে।