নিউজ ডেস্ক: কলকাতা শহরের বুকে এমন এক তীর্থস্থান, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। কেউ আসেন মনের ইচ্ছা পূরণ করতে, কেউ সংসারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ শুধুই মায়ের এক ঝলক দর্শন পেতে। শহরের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ ধর্মীয় স্থান কালীঘাট মন্দির। মা কালীর আরাধনায় এই মন্দিরের মাহাত্ম্য শুধু বাংলাতেই নয়, ছড়িয়ে রয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। কিন্তু এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রচলিত বিশ্বাস, যা অনেকেরই অজানা। সতীর কোন অঙ্গ এখানে পড়েছিল? কেন দেবীর জিভ সোনায় মোড়া? কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির? জেনে নিন কালীঘাটের পাঁচটি আকর্ষণীয় রহস্য।
১. সতীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল কালীঘাটে!
কালীঘাটকে হিন্দুধর্মের অন্যতম ৫১ শক্তিপীঠ হিসেবে মানা হয়। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, রাজা দক্ষের যজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর শোকে উন্মত্ত মহাদেব তাঁর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেন। তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করেন। কথিত আছে, সেই সময় সতীর ডান পায়ের চারটি আঙুল এসে পড়েছিল কালীঘাটে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই স্থান ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
২. দেবীর জিভ সোনার তৈরি কেন?
কালীঘাটের মা কালীর মূর্তির অন্যতম আকর্ষণ তাঁর দীর্ঘ প্রসারিত জিভ। সাধারণ কালীমূর্তির সঙ্গে এই মূর্তির বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এখানে দেবীর তিনটি বড় চোখ, চারটি হাত এবং সোনার তৈরি জিভ বিশেষভাবে নজর কাড়ে। প্রচলিত বিশ্বাসে, মহাদেবের বুকে পা পড়ার পর দেবী জিভ বের করে লজ্জা প্রকাশ করেছিলেন। সেই পৌরাণিক ভাবনাই কালীমূর্তির এই বিশেষ রূপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। দেবীর হাতে থাকা খড়্গ ও ছিন্নমুণ্ডও প্রতীকী অর্থ বহন করে। খড়্গ জ্ঞানের শক্তি এবং ছিন্নমুণ্ড মানুষের অহংকারের বিনাশের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
৩. বর্তমান মন্দিরের বয়স ২০০ বছরেরও বেশি!
অনেকেই মনে করেন, কালীঘাট মন্দিরের ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো। তবে বর্তমানে যে মন্দিরটি দেখা যায়, তার নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল ১৮০৯ সালে। বারিশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই মন্দির নির্মিত হয়। যদিও কালীঘাটের উল্লেখ আরও পুরনো বাংলা সাহিত্যেও পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতকের 'মনসার ভাসান' এবং সপ্তদশ শতকের 'কবিকঙ্কণ চণ্ডী'তে এই তীর্থস্থানের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান স্থাপত্যের বয়সের চেয়েও প্রাচীন এই পীঠস্থানের ধর্মীয় ঐতিহ্য।
৪. মা কালীর সঙ্গে রয়েছেন নকুলেশ্বর ভৈরব!
শক্তিপীঠের সঙ্গে ভৈরবের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী, কালীঘাট শক্তিপীঠের ভৈরব হলেন নকুলেশ্বর। মন্দির চত্বরে দেবী কালীর পাশাপাশি রয়েছে শিবের মন্দিরও। লোককথা অনুযায়ী, আদি গঙ্গার কাছে সতীর পায়ের আঙুলের আকৃতির একটি পাথরের সন্ধান পাওয়ার পর নকুলেশ্বরের শিবলিঙ্গের কথাও জানা যায়। সেই থেকেই দেবী ও ভৈরবের আরাধনা এই পীঠের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
৫. আদি গঙ্গার সঙ্গে কালীঘাটের গভীর সম্পর্ক!
আজকের কালীঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আদি গঙ্গার ইতিহাস। একসময় এই নদীপথ ছিল যাতায়াত ও তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, নদীর তীরেই দেবীর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন আবিষ্কারের ঘটনা ঘটে। একটি লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এক ব্রাহ্মণ নদীর কাছে পাথরের একটি অংশ খুঁজে পান, যা সতীর পায়ের আঙুল বলে মনে করা হয়েছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দেবীর আরাধনার প্রসার ঘটে। তবে এই আবিষ্কারের কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণের চেয়ে ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসের গুরুত্বই বেশি।
ইতিহাস, বিশ্বাস আর ভক্তির মিলনস্থল
কালীঘাট মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উপাসনাস্থল নয়, এটি কলকাতার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আবেগের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মন্দির। ইতিহাসের সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনি, আরাধনার সঙ্গে লোকবিশ্বাস সব মিলিয়ে কালীঘাট আজও এক অনন্য আকর্ষণ। ভক্তদের কাছে মা কালীর কাছে প্রার্থনার ভাষা একটাই মা, সকলের জীবন থেকে অন্ধকার দূর করে আলো ও মঙ্গলের পথ দেখাও।




