কলকাতা, পিউ নন্দী: রাখিবন্ধন উৎসব মানেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে চেনা। ছবি ভাই আর বোনের অমলিন সম্পর্কের সমীকরণ। কবজিতে সুতো বাঁধার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একে অপরকে আজীবন আগলে রাখার নিঃশর্ত অঙ্গীকার। তবে এই পবিত্র উৎসব কি কেবল ভাই-বোনের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ?
শাস্ত্র এবং প্রাচীন ইতিহাস কিন্তু একেবারেই অন্য কথা বলছে। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও, নিজের স্বামীর সুরক্ষায় তাঁর হাতেও রাখি পরাতে পারেন স্ত্রীরা। এটি কোনো সমাজমাধ্যমের সাময়িক ট্রেন্ড বা লাইক কুড়োনোর সস্তা কৌশল নয়, বরং সনাতন পরম্পরার এক সুপ্রাচীন অধ্যায়।
পৌরাণিক গ্রন্থ ‘ভবিষ্য পুরাণ’-এ চোখ রাখলেই দেখা মেলে এর শিকড়। সেখানে বর্ণিত রয়েছে, একদা দানব ও দেবতাদের মধ্যে যখন তুমুল সংঘাত চরমে পৌঁছায়, তখন চরম সংকটে পড়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। স্বামীর প্রাণরক্ষা ও যুদ্ধে নিশ্চিত বিজয়ের কামনায় ব্যাকুল হয়ে ওঠেন দেবী ইন্দ্রাণী। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ইন্দ্রকে বাঁচাতে তিনি দেবপতির কবজিতে বেঁধে দিয়েছিলেন একটি মন্ত্রপূত রক্ষাকবচ বা বিশেষ সূত্র।
পৌরাণিক বিশ্বাস, স্ত্রীর দেওয়া সেই রক্ষাসূত্রের অলৌকিক শক্তিতেই অসুরদের পরাস্ত করে স্বর্গে পুনপ্রতিষ্ঠিত হন ইন্দ্র। অর্থাৎ, মহাজাগতিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে প্রথম রাখি বাঁধার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন এক সহধর্মিণীই। শুধু দেবলোকেই নয়, মধ্যযুগীয় ভারতের রাজপরিবারেও এই প্রথার বহুল প্রচলন ছিল। রাজারা যখন রণক্ষেত্রে যেতেন, তখন তাঁদের অকালমৃত্যু ঠেকাতে এবং সার্বিক জয় নিশ্চিত করতে রানিরা স্বামীর হাতে সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে রাখি বেঁধে দিতেন।
তখন অবশ্য বর্তমান সময়ের মতো বিভিন্ন রকমের রাখি পাওয়া যেত না। রাকিবার রক্ষা সূত্র হিসেবে সাধারণত রঙিন লাল হলুদ সুতো ব্যবহার করা হত। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের রাখি এসেছে বাজারে।মূলত ‘রক্ষাসূত্র’ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থই হলো নিরাপত্তা ও কল্যাণের বার্তা বহন করা।
সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় এই প্রথাকে বেঁধে রাখা যায় না। তাই পারস্পরিক নির্ভরতা, দীর্ঘায়ু কামনা এবং জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে সঙ্গীকে ঢাল হয়ে রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে একজন স্ত্রী যদি স্বামীর হাতে রাখি পরিয়ে দেন, তবে তা শাস্ত্র ও যুক্তি উভয়ের নিরিখেই সম্পূর্ণ শুভ এবং অর্থপূর্ণ।