চণ্ডীগড়: ২০২৭ সালের পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় ধাক্কা আম আদমি পার্টিতে (আপ)। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দলের তিন বিধায়ক ইস্তফা দিয়ে যোগ দিলেন বিজেপিতে। সোমবার দিল্লিতে বিজেপির সদর দফতরে গিয়ে গেরুয়া শিবিরে নাম লেখান কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিংহ, হরমিত সিংহ পাঠানমাজরা এবং চেতন সিংহ জৌড়ামাজরা। ভগবন্ত মানের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, দলের অন্দরে অসন্তোষ এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে টানাপড়েন—সব মিলিয়ে ভোটের কয়েক মাস আগে পঞ্জাবের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হল।
এই দলবদলের সূত্রপাত রবিবার। আপের দুই বিধায়ক হরমিত সিংহ পাঠানমাজরা ও চেতন সিংহ জৌড়ামাজরা দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। পাঠানমাজরা সানৌর কেন্দ্রের এবং জৌড়ামাজরা সমানার বিধায়ক। সোমবার তাঁদের পথেই হাঁটেন অমৃতসর উত্তরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিংহ। তিন জনই পরে বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েক জন আপ নেতা বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন বলে খবর।
দলত্যাগের সময়টিও রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য সম্প্রতি ৪০ জন প্রার্থীর প্রথম তালিকা প্রকাশ করেছে আপ।
সেই তালিকায় সানৌর ও সমানা—কোনও কেন্দ্রেই বর্তমান বিধায়কদের নাম ছিল না। তার আগেই ওই দুই কেন্দ্রে নতুন বিধানসভা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা নিয়োগ করেছিল দল। ফলে আগামী নির্বাচনে টিকিট পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল দুই বিধায়কের। সেই অসন্তোষই কি শেষ পর্যন্ত দলত্যাগের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করল? রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন উঠছে। জৌড়ামাজরা ভগবন্ত মানের মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। পরে মন্ত্রিসভার রদবদলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দল ছাড়ার পর আপ সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তাঁর দাবি, পঞ্জাব থেকে মাদক সমস্যা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার তা পূরণ করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক কাজকর্ম এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাঠানমাজরার অভিযোগ, তাঁর বিধানসভা এলাকার উন্নয়নের জন্য অনুমোদিত ১৭ কোটি টাকা ছাড়া হয়নি। বিধানসভায় জলসংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলতে গিয়েও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলে দাবি তাঁর। রাজ্যের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং দলের নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের হওয়ার পর দীর্ঘ দিন তিনি পলাতক ছিলেন বলে খবর। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সেই বিতর্কও তাঁর সঙ্গে আপ নেতৃত্বের সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, আপের তরফে দলত্যাগী বিধায়কদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, এই নেতাদের অনেককেই আগেই দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে দলবিরোধী কাজের অভিযোগও রয়েছে। বিধানসভার স্পিকারের কাছে তাঁদের বিধায়ক পদ খারিজের আবেদন জানানো হবে বলেও আপের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর দলবদলকারী নেতাদের স্বাগত জানিয়েছে গেরুয়া শিবির। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে আস্থা রেখেই তাঁরা দলে এসেছেন। অন্য দিকে, আপের পঞ্জাব নেতৃত্ব বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেছে, অন্য দলের অসন্তুষ্ট ও বহিষ্কৃত নেতাদের দলে টেনেই পঞ্জাবে রাজনৈতিক জমি তৈরির চেষ্টা করছে বিজেপি।
পঞ্জাবে আপের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে, সরকার পরিচালনা নিয়ে বিরোধীদের আক্রমণ; অন্য দিকে, নির্বাচনের আগে দলের অন্দরের অসন্তোষ সামলানো। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল আপ। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হতেই প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ঘিরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। তিন বিধায়কের বিজেপিতে যোগদান সেই চাপ আরও বাড়াল। এবার ভোটের আগে এই দলবদল পঞ্জাবের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার।




