নিজস্ব প্রতিবেদন: স্কুলে যাওয়ার বয়স কি শুধুই শৈশব? বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, মাথায় পাকা চুল, মুখে সময়ের অজস্র ছাপ। অথচ চোখে একরাশ কৌতূহল। পরনে গোলাপি শাড়ি, কাঁধে স্কুলব্যাগ, হাতে স্লেট আর চক। এমনই এক অভিনব ছবি দেখা গিয়েছে মহারাষ্ট্রের ঠাণে জেলার ফাঙ্গানে গ্রামে। এখানে স্কুলের বেঞ্চে ছোটরা নয়, পড়াশোনা করেন দিদিমারা। তাঁদের এই ব্যতিক্রমী শিক্ষাঙ্গনের নাম ‘আজিবাইচি শালা’ (Aajibaichi Shala), যার অর্থ দিদিমাদের স্কুল।
https://www.instagram.com/reel/DRCB8WLDKtZ/?utm_source=ig_web_copy_link&obrf=NTc4MTIwNjQ2YQ==
৬০ থেকে ৯০, বয়স এখানে বাধা নয়
যে বয়সে অধিকাংশ মানুষ অবসরজীবন কাটান, সেই বয়সেই নতুন করে অক্ষর চেনার আনন্দে মেতেছেন এই স্কুলের পড়ুয়ারা। কারও বয়স ষাটের কোঠায়, কেউ সত্তর কিংবা আশি পেরিয়েছেন। নব্বই বছর বয়সেও স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন কেউ কেউ।
এই মহিলাদের অনেকেই ছোটবেলায় স্কুলের দরজা পেরোনোর সুযোগ পাননি। সংসার, সন্তান পালন এবং দৈনন্দিন দায়িত্বের চাপে চাপা পড়েছিল লেখাপড়ার ইচ্ছা। তবে জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সুযোগ এসেছে তাঁদের সামনে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শুরু হয়েছিল পথচলা
২০১৬ সালের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যাত্রা শুরু করে ‘আজিবাইচি শালা’। স্থানীয় শিক্ষক যোগেন্দ্র বাঙ্গারের উদ্যোগে এবং মোতিরাম দালাল চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে এই বিশেষ বিদ্যালয়।
গ্রামের প্রবীণ মহিলাদের অনেকেই ধর্মীয় বই পড়তে চাইতেন, কিন্তু অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তা সম্ভব হত না। তাঁদের সেই ইচ্ছাই নতুন একটি স্কুল তৈরির অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
প্রথম দিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুর দুটো থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত চলত এই স্কুলের ক্লাস। পড়াশোনার পাশাপাশি ছিল ছড়া শেখা, সংখ্যা চেনা এবং সাধারণ অঙ্ক কষার পাঠ।
গোলাপি শাড়িই স্কুলের ইউনিফর্ম
এই স্কুলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল পড়ুয়াদের পোশাক। প্রত্যেকের পরনে একই ধরনের উজ্জ্বল গোলাপি শাড়ি। সঙ্গে স্কুলব্যাগ, স্লেট, চক এবং বইখাতা।
শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষিকার নির্দেশ মেনে মারাঠি ভাষার বর্ণমালা লেখার চেষ্টা করেন তাঁরা। কখনও বোর্ডে গিয়ে অক্ষর লেখেন, কখনও একসঙ্গে ছড়া আওড়ান। ভুল হলে আবার নতুন করে শুরু করেন।
কিন্তু এই স্কুলের সবচেয়ে বড় সাফল্য পরীক্ষার নম্বর নয়। নিজের নাম নিজে লিখতে পারা, প্রয়োজনীয় কাগজ পড়তে শেখা কিংবা আঙুলের ছাপের পরিবর্তে নিজের স্বাক্ষর করতে পারাই তাঁদের কাছে বিরাট অর্জন।
শুধু পড়াশোনা নয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প
শিক্ষার পাশাপাশি এই স্কুল প্রবীণ মহিলাদের জীবনে এনে দিয়েছে বন্ধুত্ব, আনন্দ এবং আত্মমর্যাদার অনুভূতি।
একসময় যাঁরা ভাবতেন বয়স হয়ে যাওয়ায় নতুন কিছু শেখা সম্ভব নয়, তাঁরাই এখন প্রমাণ করছেন ইচ্ছাশক্তির কাছে বয়স কোনও বাধা নয়।
নিজেদের জীবনের দীর্ঘ সময় অন্যদের যত্নে কাটানোর পর এই মহিলারা অবশেষে কিছুটা সময় দিচ্ছেন নিজেদের স্বপ্নকে। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীনভাবে বাঁচার আত্মবিশ্বাস।
শিক্ষার কোনও বয়স হয় না
‘আজিবাইচি শালা’ কেবল একটি বিদ্যালয়ের নাম নয়। এটি নারীশিক্ষা, আত্মনির্ভরতা এবং জীবনের দ্বিতীয় সুযোগের এক অনন্য উদাহরণ।
শিক্ষা যে শুধুমাত্র চাকরি কিংবা পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের পরিচয় ও আত্মসম্মান খুঁজে পাওয়ারও পথ, সেই বার্তাই দেয় মহারাষ্ট্রের এই ছোট্ট স্কুল।
একসময় যে হাত সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সামলেছে, সেই হাতেই আজ স্লেটের উপর ফুটে উঠছে নতুন অক্ষর। আর প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে যেন লেখা হচ্ছে এক নতুন জীবনের গল্প।
কারণ শেখার জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন শুধু ইচ্ছা।




