বিশেষ প্রতিবেদন: মানুষের রোগ নির্ণয়, নতুন ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই কিংবা চিকিৎসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষাগারে ইঁদুর, খরগোশ, কুকুর, বানরের মতো প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানো হয়ে আসছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ক্রমশ সেই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে চাইছে। মানবকোষ, কৃত্রিম অঙ্গ, অর্গান-অন-চিপ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার মডেলিংয়ের মতো পদ্ধতি এখন গবেষণার নতুন দিশা দেখাচ্ছে। লক্ষ্য, প্রাণীর উপর পরীক্ষা কমিয়ে মানুষের শরীরের সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতিতে ওষুধ ও চিকিৎসার নিরাপত্তা যাচাই। অথচ সেই সময়েই ভারতের প্রস্তাবিত নতুন বিধি ঘিরে উঠেছে উলটো পথে হাঁটার অভিযোগ। আশঙ্কা, পরীক্ষাগারে প্রাণীর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে যে নজরদারি এত দিন ছিল, নতুন নিয়মে তার কিছুটা শিথিল হতে পারে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস (কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন অব এক্সপেরিমেন্ট, ব্রিডিং অ্যান্ড ট্রেডিং অব ল্যাবরেটরি অ্যানিম্যালস) রুলস, ২০২৬’। প্রাণীদের উপর পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কমিটি ফর কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন অব এক্সপেরিমেন্টস অন অ্যানিম্যালস (সিসিএসইএ) এই খসড়া বিধি এনেছে। এর মাধ্যমে ১৯৬৮ ও ১৯৯৮ সালের কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, গবেষণার অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা প্রয়োজন। কিন্তু পশু অধিকারকর্মী ও বিজ্ঞান-নীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, সেই সরলীকরণের আড়ালে স্বাধীন নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
কী বদলাতে চলেছে নতুন বিধিতে?
প্রস্তাবিত নিয়মে পরীক্ষার সময় প্রাণীর সম্ভাব্য যন্ত্রণা বা অস্বস্তির মাত্রা অনুযায়ী গবেষণাকে চারটি ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে—মৃদু, মাঝারি, গুরুতর এবং এমন পরীক্ষা, যার পর প্রাণীকে আর জীবিত রাখা হবে না। এই শ্রেণিবিভাগের ভিত্তিতে অনুমোদনের ক্ষমতাও ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। মৃদু ও মাঝারি মাত্রার পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইনস্টিটিউশনাল অ্যানিম্যাল এথিক্স কমিটি (আইএইসি) অনুমোদন দিতে পারবে। গুরুতর বা ‘নন-রিকভারি’ ধরনের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে, বিশেষত ইঁদুর ও খরগোশের চেয়ে বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে।
সমস্যা দেখা দিচ্ছে এই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নিয়েই। কারণ, কোনও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কমিটি সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার অনুমোদন দিলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সদস্যদেরই যদি পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা থাকে, তা হলে সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানোর আগে স্বাধীন ও কেন্দ্রীয় স্তরে যথাযথ পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি। পরে পরিদর্শন বা রিপোর্ট জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেই যে সব অনিয়ম আটকানো যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
বিজ্ঞান কি সত্যিই প্রাণী-পরীক্ষার বিকল্প খুঁজে পেয়েছে?
বিজ্ঞানের নতুন পদ্ধতিগুলির মধ্যে অন্যতম ‘অর্গান-অন-চিপ’। ক্ষুদ্র একটি যন্ত্রের মধ্যে জীবন্ত মানবকোষ ব্যবহার করে মানুষের ফুসফুস, যকৃৎ বা অন্য কোনও অঙ্গের নির্দিষ্ট কাজের অনুকরণ করা যায়। ফলে কোনও রাসায়নিক বা ওষুধ মানবদেহের নির্দিষ্ট অঙ্গে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিকভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ‘অর্গানয়েড’। মানবকোষ থেকে পরীক্ষাগারে তৈরি করা হয় ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক কোষগুচ্ছ, যা শরীরের কোনও অঙ্গের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও কাজের অনুকরণ করতে পারে। পাশাপাশি রয়েছে থ্রি-ডি টিস্যু কালচার, কোষভিত্তিক পরীক্ষা এবং কম্পিউটার মডেলিং। কোনও ওষুধ শরীরে কী ভাবে কাজ করতে পারে, তার সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা আগাম অনুমান করতেও এই প্রযুক্তিগুলি সাহায্য করছে।
তবে এই পদ্ধতিগুলি এখনও সব ক্ষেত্রে প্রাণী-পরীক্ষার সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। মানবদেহে বিভিন্ন অঙ্গ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে যে জটিল সম্পর্ক রয়েছে, তা একক কোনও পরীক্ষাগার পদ্ধতিতে পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা কঠিন। ফলে আপাতত অনেক ক্ষেত্রে প্রাণী-পরীক্ষা ও বিকল্প প্রযুক্তি পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, যেখানে মানবদেহনির্ভর পদ্ধতিতে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া সম্ভব, সেখানে প্রাণীর ব্যবহার বন্ধ করা।
প্রাণী-পরীক্ষা কতটা নির্ভরযোগ্য?
প্রাণীর শরীরে কোনও ওষুধ নিরাপদ প্রমাণিত হলেই যে মানুষের শরীরেও তা একই ভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ ও অন্য প্রাণীর জিনগত গঠন, বিপাকীয় প্রক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে প্রাণীর শরীরে পাওয়া ফল মানুষের ক্ষেত্রে সব সময় মেলে না।
২০০৬ সালে ‘টিজিএন১৪১২’ নামে একটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এই সীমাবদ্ধতার বহুল আলোচিত উদাহরণ। পরীক্ষাগারে প্রাণীর উপর পরীক্ষায় ওষুধটি নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু মানুষের উপর প্রথম পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬ জন স্বেচ্ছাসেবকের প্রত্যেকেই গুরুতর রোগ প্রতিরোধ-সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, প্রাণী-পরীক্ষার ফলকে মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রাণী-পরীক্ষার কোনও বৈজ্ঞানিক মূল্য নেই। বরং বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, জটিল রোগ ও নতুন চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রাণী-পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে আরও উন্নত, মানবদেহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ভারতের নিজেরই রয়েছে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের নজির
প্রাণী-পরীক্ষা কমানোর ক্ষেত্রে ভারত একেবারে পিছিয়ে নেই। ২০১৪ সাল থেকেই দেশে প্রসাধনী পরীক্ষার জন্য প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ। ২০২০ সালের কসমেটিক্স বিধিতেও সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। আবার ২০২৩ সালে নিউ ড্রাগস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস বিধির সংশোধনের মাধ্যমে নতুন ওষুধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোষভিত্তিক পরীক্ষা, অর্গান-চিপ, মাইক্রোফিজিওলজিক্যাল সিস্টেম এবং কম্পিউটার মডেলিংয়ের মতো পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর সহায়তায় ৭১টি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারে প্রাণী-নির্ভর নয়, এমন ১০৯টি গবেষণা প্রকল্পকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিকল্প প্রযুক্তির বিকাশে দেশের গবেষণামহলেও কাজ চলছে। কিন্তু এই পদ্ধতিগুলিকে আরও বেশি ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজন পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বীকৃতি।
নতুন বিধি নিয়ে কেন উদ্বেগ?
পশু অধিকার সংগঠনগুলির আপত্তি শুধু অনুমোদন প্রক্রিয়া ঘিরে নয়। খসড়া বিধিতে নির্দিষ্ট শর্ত ও অনুমতি সাপেক্ষে বন্য প্রাণী, বন্য পরিবেশ থেকে ধরা প্রাণী এবং পথকুকুর বা পথবিড়ালের মতো প্রাণীদের পরীক্ষায় ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষাগারে ব্যবহারের জন্য প্রজনন করা প্রাণীর তুলনায় এদের স্বাস্থ্য, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পূর্ববর্তী পরিবেশ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনেক সময় থাকে না। ধরা, পরিবহণ এবং নতুন পরিবেশে আটকে রাখার ফলে তাদের উপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি হতে পারে।
আরও একটি উদ্বেগ, পরীক্ষার যন্ত্রণার মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাণীর আকার বা প্রজাতির বদলে প্রকৃত কষ্টের মাত্রাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পশু অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, প্রাণীকে দীর্ঘ সময় একা আটকে রাখা, চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা কিংবা যন্ত্রণাদায়ক পরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে কঠোর ও স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। পাশাপাশি পরীক্ষার সময় পশুচিকিৎসকের উপস্থিতি, ব্যথা কমানোর ব্যবস্থা এবং প্রাণীর অসহনীয় কষ্ট শুরু হলে পরীক্ষা বন্ধ করার নির্দিষ্ট নিয়মও জরুরি।
বিশ্বজুড়েই এখন প্রাণী-নির্ভর গবেষণা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার প্রবণতা বাড়ছে। আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের মতো জায়গায় মানবদেহনির্ভর বিকল্প পদ্ধতির গবেষণা ও স্বীকৃতির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের নতুন বিধি যদি প্রাণী-পরীক্ষার অনুমোদন সহজ করে, অথচ বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করার মতো শক্তিশালী ব্যবস্থা না রাখে, তা হলে দেশের গবেষণা নীতি আন্তর্জাতিক প্রবণতার তুলনায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণী-পরীক্ষা এক ধাক্কায় বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যেখানে বৈজ্ঞানিক ভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প রয়েছে, সেখানে প্রাণী ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে সেই বিকল্প কেন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, তার যুক্তি গবেষকদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া উচিত। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে কত প্রাণী ব্যবহার হচ্ছে, কত প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে এবং কত অভিযোগ জমা পড়ছে—তার বার্ষিক পরিসংখ্যান প্রকাশের জন্য জাতীয় স্তরে স্বচ্ছ তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিতর্কের কেন্দ্রে তাই শুধু প্রাণীর অধিকার নয়, রয়েছে বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎও। এক দিকে দ্রুত গবেষণা ও নতুন ওষুধ আবিষ্কারের প্রয়োজন, অন্য দিকে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধ এবং মানুষের শরীরের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাপদ্ধতি তৈরি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হল, ভারত কি আধুনিক গবেষণার নতুন দিশায় বিনিয়োগ বাড়াবে, নাকি পুরনো প্রাণী-নির্ভর ব্যবস্থাকেই আরও সহজ করে তুলবে? নতুন বিধির চূড়ান্ত রূপ সেই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে।




