নয়াদিল্লি: লাদাখের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নতুন ইতিহাস গড়ল ভারতীয় বায়ুসেনা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩,৬২৯ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ন্যোমা বিমানঘাঁটিতে সফল ভাবে অবতরণ করল বায়ুসেনার ভারী পরিবহণ বিমান IL-76MD। বায়ুসেনার দাবি, এই প্রথম বিশ্বের কোথাও এত বেশি উচ্চতায় অবতরণ করল এই ধরনের বিমান। চিন সীমান্তের কাছাকাছি কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানঘাঁটিতে এমন বড় মাপের পরিবহণ বিমান নামাতে পারা ভারতের সামরিক রসদ সরবরাহ ও সেনা মোতায়েনের সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করল।
শনিবার এই সাফল্যের কথা জানিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনা জানায়, IL-76MD-র এই অবতরণ শুধু বিমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ নয়, একই সঙ্গে চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং পেশাদারিত্বেরও পরিচয়। বায়ুসেনার বক্তব্য, এই সাফল্য ভারতের কৌশলগত বিমান পরিবহণ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। রুশ প্রযুক্তিতে তৈরি এই বিমান বায়ুসেনার কাছে পরিচিত ‘গজরাজ’ নামে।
ন্যোমা বিমানঘাঁটির অবস্থানই এই সাফল্যকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) থেকে প্রায় 25 কিলোমিটার দূরে এই ঘাঁটি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 13,000 ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে বিমান ওঠানামা করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে ভারী পরিবহণ বিমানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের ঘনত্ব কমে যায়। ফলে বিমানের ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা এবং ডানায় তৈরি হওয়া উত্তোলনক্ষমতা- দু’টিই প্রভাবিত হয়। এই পরিস্থিতিতে রানওয়েতে নিরাপদে অবতরণ এবং ফের উড়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা ও সতর্ক হিসাবনিকাশ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ন্যোমা?
লাদাখের সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনা মোতায়েন, অস্ত্রশস্ত্র, ভারী যন্ত্রপাতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া ভারতের সামরিক প্রস্তুতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা, তুষারপাত, প্রবল ঠান্ডা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় সড়কপথে যাতায়াত ব্যাহত হয়। সে ক্ষেত্রে বিমানপথে দ্রুত রসদ পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যোমায় IL-76MD-র মতো ভারী পরিবহণ বিমানের অবতরণ সেই কাজের বিকল্প ও সক্ষমতা দু’টিই বাড়াতে পারে।
প্রায় 3 কিলোমিটার দীর্ঘ কংক্রিটের রানওয়ে-সহ ন্যোমা ঘাঁটিকে এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সেখানে যুদ্ধবিমান, পরিবহণ বিমান এবং হেলিকপ্টার পরিচালনা করা যায়। 2025 সালের 12 নভেম্বর তৎকালীন বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং C-130J পরিবহণ বিমান নিয়ে এই ঘাঁটিতে অবতরণ করে তার উদ্বোধন করেছিলেন। বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম যুদ্ধবিমান পরিচালনাযোগ্য বিমানঘাঁটি হিসেবে ন্যোমার গুরুত্ব তখন থেকেই বেড়েছে।
‘গজরাজ’-এর ভূমিকা কী?
IL-76MD রুশ নির্মিত চার ইঞ্জিনের ভারী পরিবহণ বিমান। সেনা, সামরিক যান, অস্ত্রশস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ রসদ বহনের জন্য এই বিমান ব্যবহার করে বায়ুসেনা। প্রায় 40 থেকে 45 টন পর্যন্ত ভার বহনে সক্ষম এই বিমান ভারতের কৌশলগত বিমান পরিবহণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লাদাখ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো দুর্গম এলাকায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে দীর্ঘদিন ধরেই এই বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে।
ন্যোমায় এই বিমানের অবতরণে শুধু একটি উচ্চতার রেকর্ড তৈরি হল না, বরং পূর্ব লাদাখে ভারী সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হল। বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা ও রসদ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
লাদাখে লেহ, কার্গিল এবং থোইসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে। এ ছাড়াও দৌলত বেগ ওল্ডি এবং ফুকচের মতো অগ্রবর্তী অবতরণক্ষেত্র সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। তবে সব ঘাঁটিতে IL-76MD-র মতো ভারী পরিবহণ বিমান নামানো সম্ভব নয়। সেই দিক থেকে ন্যোমার সক্ষমতা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
2020 সালে গালওয়ান সংঘর্ষের পর চিন সীমান্তে সামরিক পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর দিয়েছে ভারত। সীমান্তবর্তী এলাকায় রাস্তা, সেতু, বিমানঘাঁটি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ন্যোমায় IL-76MD-র সফল অবতরণ সেই পরিকাঠামোগত প্রস্তুতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তবে এই সাফল্যের তাৎপর্য শুধু চিন সীমান্তে সামরিক শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়—প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা ও রসদ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোই এর বড় দিক। বায়ুসেনার কাছে তাই ১৩,৬২৯ ফুট উচ্চতায় ‘গজরাজ’-এর এই অবতরণ নিছক একটি রেকর্ড নয়। হিমালয়ের দুর্গম ভূখণ্ডে ভারতের সামরিক বিমান পরিবহণ ব্যবস্থার সক্ষমতা কতটা বাড়ানো সম্ভব, তারই এক উল্লেখযোগ্য পরীক্ষা।




