ওয়াশিংটন: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে গোপন তথ্য দিতে পারলেই মিলবে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা। শুধু আর্থিক পুরস্কার নয়, প্রয়োজন হলে তথ্যদাতাকে অন্য দেশে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করবে আমেরিকা। ইরানের পরমাণু কেন্দ্র, প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও অন্যান্য কর্মীদের সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে এই পুরস্কার ঘোষণা করেছে মার্কিন বিদেশ দফতর। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এক দিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্য দিকে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে পুরস্কার ঘোষণা করল ওয়াশিংটন। ফলে আমেরিকার কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সমাজমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়ে এই পুরস্কারের কথা জানায়। মার্কিন বিদেশ দফতরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় এই অর্থ দেওয়া হবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কোনও গোপন তথ্য, পরমাণু কেন্দ্রের অবস্থান, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারলে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের পাশাপাশি এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত অন্য কর্মীদের গতিবিধি সম্পর্কেও তথ্য চেয়েছে আমেরিকা।
তবে কোন ধরনের তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও শর্ত প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন। পুরস্কারের অঙ্ক তথ্যের গুরুত্ব ও কার্যকারিতার উপর নির্ভর করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তথ্যদাতার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে তাঁকে অন্য দেশে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ১৯৮৪ সালে মার্কিন বিদেশ দফতরের উদ্যোগে ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি চালু হয়েছিল। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, অপরাধচক্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য পেতে অতীতেও এই কর্মসূচির মাধ্যমে পুরস্কার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।
ইরানের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের পিছনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা IAEA-র উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছে আমেরিকা। মার্কিন বিদেশ দফতরের বক্তব্য, পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা পালনে ইরানের অসহযোগিতার কারণে সে দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের উৎপাদন ও মজুত সম্পর্কে সংস্থাটির নজরদারি ব্যাহত হয়েছে। ‘কন্টিনিউটি অফ নলেজ’ বা ধারাবাহিক তথ্য-নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের।
উল্লেখ্য, IAEA-র তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পরমাণু বিশেষজ্ঞেরা। যদিও ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার মতো অসামরিক প্রয়োজনেই তা ব্যবহার করা হয়। এই পুরস্কার ঘোষণার সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, আমেরিকার সামরিক হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
অথচ এখন সেই কর্মসূচির কেন্দ্র, সরঞ্জাম ও বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে বিপুল অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করছে তাঁর প্রশাসন। ফলে ইরানের পরমাণু পরিকাঠামোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কাছে কতটা তথ্য রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শুক্রবার ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছতে চাইছে। তাঁর কথায়, তেহরান সমঝোতায় পৌঁছনোর জন্য যথেষ্ট আগ্রহী। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি আট মাসের সংঘাতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার অবস্থান যে কঠোর, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এ দিকে, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চালাচ্ছে দুই দেশ। ইরান কাতারের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে একটি প্রস্তাবও পাঠিয়েছে বলে খবর। তবে আলোচনায় বসার আগে তেহরান কয়েকটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলির উপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। অন্য দিকে, ওয়াশিংটন চাইছে, যে কোনও চুক্তির মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত ও পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ অন্তর্ভুক্ত থাকুক।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও কমেনি। শুক্রবার ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে সে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সীমিত হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইরানের একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে দ্বীপটিতে বিস্ফোরণের খবর সামনে এসেছিল। হরমুজ প্রণালীর কাছে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ ঘিরে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
সব মিলিয়ে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার দ্বিমুখী তৎপরতা স্পষ্ট।
এক দিকে যুদ্ধ থামাতে সমঝোতার চেষ্টা, অন্য দিকে পরমাণু কর্মসূচির অন্দরমহলের তথ্য পেতে বিপুল পুরস্কারের ঘোষণা। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়, তার উপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। তবে ২০ মিলিয়ন ডলারের এই ঘোষণা বুঝিয়ে দিল, যুদ্ধবিরতি বা চুক্তির আলোচনা চললেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা তৎপরতা থেমে নেই।




