নয়াদিল্লি: শীতের শুরুতেই ফের বিষাক্ত বাতাসের কবলে দেশের রাজধানী। দীপাবলির আগে দিল্লির বায়ুদূষণ ক্রমশ বিপজ্জনক চেহারা নিচ্ছে। একাধিক এলাকায় বায়ুর গুণমান সূচক বা একিউআই (AQI) 400 পেরিয়ে ‘সিভিয়ার’ বা ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে দূষণ মোকাবিলায় দিল্লির বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলল কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা সামনে আনা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। সাময়িক ব্যবস্থা এবং দায় এড়ানোর রাজনীতি চললেও দূষণের মূল উৎসগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি দেবেন্দ্র যাদবের অভিযোগ, বর্তমান সরকারের আমলে রাজধানীর বাতাসের মান ক্রমশ খারাপ হয়েছে। একাধিক নজরদারি কেন্দ্রে একিউআই ‘সিভিয়ার’ স্তরে পৌঁছনোই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দিচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, সরকারের বহুল প্রচারিত শীতকালীন দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা করলেই হবে না, দূষণের উৎস চিহ্নিত করে সময়সীমা বেঁধে পদক্ষেপ করতে হবে।
দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেসের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যাদব আরও বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণও পরিস্থিতির গুরুত্ব সামনে এনেছে। বিশেষ করে যানবাহনের ধোঁয়া, যানজট এবং রাস্তার ধুলো যে রাজধানীর দূষণের অন্যতম বড় কারণ, সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন পরিবেশকর্মীরা। কংগ্রেসের অভিযোগ, একের পর এক সরকার দূষণের দায় মূলত পঞ্জাব-হরিয়ানার খড় পোড়ানোর উপর চাপিয়ে দিলেও দিল্লির অভ্যন্তরীণ দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
দূষণের সাম্প্রতিক চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল 4টেয় দিল্লির গড় একিউআই ছিল 382, যা ‘ভেরি পুওর’ বা অত্যন্ত খারাপ শ্রেণির মধ্যে পড়ে। তবে একাধিক এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পাঞ্জাবি বাগ, ডিটিইউ, জাহাঙ্গিরপুরী, রোহিণী, আর কে পুরম-সহ বিভিন্ন এলাকায় একিউআই 400 ছাড়িয়েছে। কোথাও কোথাও তা 450-এরও বেশি। একিউআই 401 থেকে 500-এর মধ্যে থাকলে তাকে ‘সিভিয়ার’ বা ভয়াবহ বলে চিহ্নিত করা হয়।
পরিস্থিতির অবনতি আঁচ করে শুক্রবারই দিল্লি-সহ জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান বা গ্র্যাপের তৃতীয় পর্যায়ের বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (সিএকিউএম)। এর ফলে দিল্লি এবং সংলগ্ন পাঁচটি উচ্চ যানবাহন চলাচলকারী জেলায় বিএস-3 পেট্রল ও বিএস-4 ডিজেল চার চাকার গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ, গাজিয়াবাদ, গৌতম বুদ্ধ নগর এবং সোনিপতেও এই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।
এ ছাড়াও ধুলো তৈরি হয় এমন বড় নির্মাণ ও ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাথর খাদান ও ক্রাশারগুলির উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের জন্য স্কুলে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাসের বিকল্প ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি দফতরে কর্মীদের 50 শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। গ্র্যাপের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের বিধিনিষেধও বহাল থাকছে।
তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ধরনের জরুরি বিধিনিষেধ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দিল্লির দূষণের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করতে পারে না। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পাঞ্চলের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলো, রাস্তার ধুলো, আবর্জনা পোড়ানো এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলির খড় পোড়ানোর ধোঁয়া—সব মিলিয়েই রাজধানীর বাতাস দূষিত হচ্ছে। শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে দূষিত কণা মাটির কাছাকাছি আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দিল্লির বাতাসের মান ‘সিভিয়ার’ থেকে ‘ভেরি পুওর’ স্তরের মধ্যে থাকতে পারে। আবহাওয়ার প্রতিকূল পরিস্থিতি দূষণ ছড়িয়ে পড়ার পথে বাধা তৈরি করছে। দীপাবলির বাজি থেকেও দূষণের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কংগ্রেস নেতা শশী তারুরও দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজধানীর এই অবস্থা দেশের পক্ষে লজ্জাজনক। অন্য দিকে, কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ জাতীয় স্বচ্ছ বায়ু কর্মসূচি বা ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম নতুন করে পর্যালোচনার দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, দূষণের সমস্যা শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়, উত্তর ভারতের একাধিক শহরেও বায়ুর মান উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজধানীর কয়েক কোটি বাসিন্দার স্বাস্থ্য। শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্ট-সহ নানা রোগে আক্রান্ত মানুষ দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। প্রতি বছর শীত এলেই দিল্লিতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ফলে জরুরি বিধিনিষেধের পাশাপাশি যানবাহন ও শিল্পের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, গণপরিবহণের উন্নতি, নির্মাণকাজে ধুলো রোধ এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর।




