নয়াদিল্লি: ক্যানভাস নেই, রং-তুলি নেই, নেই কোনও ডিজিটাল গ্রাফিক্সের কারসাজি! ছবি আঁকার মাধ্যম একটি ছোট বিমান, আর ক্যানভাস বিস্তীর্ণ আকাশ। টানা ৮ ঘণ্টা ৮ মিনিট ধরে বিমান উড়িয়ে আকাশের মানচিত্রে জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো ৬’ বা GTA 6-এর বিশাল ছবি এঁকে তাক লাগিয়ে দিলেন এক মার্কিন পাইলট। তাঁর তৈরি সেই ছবি এখন সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। বিমান চলাচল এবং গেমিং দুনিয়া—দুই ক্ষেত্রের অনুরাগীদের কাছেই অভিনব এই কীর্তি রীতিমতো চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই অসাধ্যসাধন করেছেন আমেরিকার আরকানসাসের পাইলট বেঞ্জামিন ম্যাকড্যানিয়েল। সমাজমাধ্যমে তিনি পরিচিত ‘দ্য পাইলট পিকাসো’ নামে। গত ৫ নভেম্বর নিজের সেসনা স্কাইলেন আরজি বিমান নিয়ে আকাশে পাড়ি দেন তিনি। যাত্রা শুরু করেছিলেন আরকানসাসের বেন্টনভিল বিমানঘাঁটি থেকে। প্রায় ৮ ঘণ্টা ৮ মিনিট পর একই বিমানঘাঁটিতে ফিরে আসেন। কিন্তু এই দীর্ঘ উড়ানের উদ্দেশ্য শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছনো ছিল না। গোটা সময় ধরে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমান চালিয়ে এমন একটি পথ তৈরি করেন, যা পরে ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে GTA 6-এর বিশাল ছবির আকার নেয়।
ছবিতে রয়েছে GTA 6-এর লোগো। তার আশপাশে দেখা যাচ্ছে একটি হেলিকপ্টার, কুমির, পাম গাছ, স্পোর্টস কার এবং এক মহিলার অবয়ব। গেমটির কাহিনির প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছবিতে ফ্লোরিডা-অনুপ্রাণিত বিভিন্ন উপাদানও রেখেছেন তিনি। বিশেষ করে কুমিরের অবয়ব তৈরি করতে বিমানকে বারবার দিক পরিবর্তন করাতে হয়েছে। প্রতিটি বাঁক এবং উড়ানের গতিপথ ছিল আগে থেকে পরিকল্পিত।
তবে এই ছবি সাধারণ মানুষের চোখে আকাশে দৃশ্যমান কোনও আঁকিবুঁকি নয়। বিমানটি আকাশে যে পথে উড়েছে, সেই পথের তথ্যই ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটে ছবির আকারে ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ, মাটি থেকে তাকালে আকাশে কোনও ছবি দেখা যাবে না। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো পরিষেবায় বিমানের যাত্রাপথ অনুসরণ করলেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠবে সেই শিল্পকর্ম। এক কথায়, বিমানের অবস্থান ও গতিপথকেই ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন ম্যাকড্যানিয়েল।
নিজের এই কীর্তির কথা জানিয়ে সমাজমাধ্যমে মজার ছলেই লিখেছেন, GTA 6-এর ছবি আঁকতে তাঁর ৮ ঘণ্টা লেগেছে। তবে বাস্তবে এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করেছেন প্রায় ১১ বছর ধরে। উল্লেখ্য, GTA সিরিজের পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গেমারদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ রয়েছে। আগামী ১৯ নভেম্বর ২০২৬-এ প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ এক্স ও এস-এ গেমটি প্রকাশের কথা। সেই অপেক্ষাকেই যেন অন্য মাত্রা দিলেন এই পাইলট।
অবশ্য আকাশে ছবি আঁকার ঘটনা এই প্রথম নয়। ম্যাকড্যানিয়েল এর আগেও বিমানের গতিপথ ব্যবহার করে একাধিক বিখ্যাত ছবি তৈরি করেছেন। তাঁর আগের কাজের মধ্যে রয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ এবং এডভার্ড মুঙ্কের বিখ্যাত ছবি ‘দ্য স্ক্রিম’-এর অনুকরণ। এ ছাড়াও স্পাইডারম্যান, ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’, ‘স্কাইরিম’ এবং ‘ঘোস্টবাস্টার্স’-এর মতো জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়কে বিমানের উড়ানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
এই ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করতে শুধু সৃজনশীলতা থাকলেই চলে না, প্রয়োজন অসাধারণ পরিকল্পনা, নেভিগেশন দক্ষতা এবং দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা। প্রথমে কাগজে বা ডিজিটাল মাধ্যমে ছবির নকশা তৈরি করতে হয়। তার পর সেই নকশাকে এমন একটি উড়ানপথে রূপান্তরিত করতে হয়, যা বাস্তবে বিমান চালিয়ে অনুসরণ করা সম্ভব। প্রতিটি বাঁক, উচ্চতা, অবস্থান এবং বিমানের সক্ষমতার কথা মাথায় রাখতে হয়। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে উড়ান পিছিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
প্রযুক্তির যুগে শিল্পের সংজ্ঞা যে কতটা বদলে যেতে পারে, ম্যাকড্যানিয়েলের এই কীর্তি তারই উদাহরণ। যেখানে সাধারণত বিমান চলাচলের তথ্য ব্যবহার করা হয় নিরাপত্তা ও যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণের কাজে, সেখানে সেই তথ্যকেই শিল্পের মাধ্যম করে তুলেছেন তিনি। আর GTA 6-কে ঘিরে বিপুল উন্মাদনার আবহে তাঁর এই অভিনব উদ্যোগ নতুন করে বুঝিয়ে দিল, প্রিয় ভিডিও গেমের প্রতি অনুরাগ প্রকাশের জন্য ভক্তরা কতটা অপ্রচলিত পথ বেছে নিতে পারেন।




