মুম্বই: দীপাবলির আগে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ মহারাষ্ট্র সরকারের। উৎসবের মরসুমে খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার সুযোগে যাতে নিম্নমানের বা ভেজাল খাবার বাজারে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে বিশেষ অভিযান চালাল মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। আর সেই অভিযানের জেরেই শাস্তির মুখে পড়েছে একাধিক পরিচিত সংস্থা ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠান। তালিকায় রয়েছে বিরিয়ানি বাই কিলো, ডি-মার্ট, জেপ্টো এবং ব্লিঙ্কিটের মতো নাম।
৪ ও ৫ নভেম্বর, দু’দিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। তাতে মোট ১০৫টি খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে এফডিএ। এর মধ্যে শুধু মুম্বইতেই ২৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের ৭টি খাদ্যপ্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৬৯টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ১.৩৫ কোটি টাকার সন্দেহজনক, অনিরাপদ বা ভেজাল খাদ্যপণ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
মুম্বইয়ে জেপ্টোর ওরলি কেন্দ্র এবং ব্লিঙ্কিট পরিচালনাকারী ব্লিঙ্ক কমার্স প্রাইভেট লিমিটেডের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিরিয়ানি বাই কিলো, টসিন পিৎজা-র ওরলি শাখা এবং জাম্বো বার্গারের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন। অন্য দিকে, নাগপুরের কামথি রোডে ডি-মার্টের একটি বিপণিতে লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে পরিশোধিত সয়াবিন তেলও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তবে শুধু লাইসেন্স সাসপেন্ড করেই থেমে থাকেনি প্রশাসন। মুম্বইয়ের বোরিভলিতে রাজধানী বিরিয়ানি সেন্টারকে সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই-এর বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এই পদক্ষেপ। রাজ্যের অন্য এলাকাতেও একাধিক খাদ্যপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুনেতে ৩টি, অমরাবতীতে ২টি এবং মুম্বই ও কোঙ্কন অঞ্চলে ১টি করে প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছে।
১.৩৫ কোটি টাকার খাবার বাজেয়াপ্ত
এফডিএ-র অভিযানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে মাওয়া, খোয়া, পনির, ঘি, ভোজ্য তেল, ফারসান, শুকনো ফল এবং নানা ধরনের মিষ্টি। প্রশাসনের আশঙ্কা, এই সব পণ্যের মধ্যে কিছু খাবার অনিরাপদ বা ভেজাল হতে পারে। তাই পরীক্ষার জন্য সেগুলি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। তিনটি জায়গা থেকে গুটখা ও পানমশলা বাজেয়াপ্ত করার ঘটনায় ৩টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২ জনকে। পাশাপাশি ২টি গাড়িও আটক করেছে প্রশাসন।
এফডিএ কমিশনার তুকারাম মুন্ধে জানিয়েছেন, খাদ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কোনও সংস্থাকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বড় ব্র্যান্ড হোক বা ছোট ব্যবসা, নিয়ম সবার জন্য সমান। মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন এই অভিযান?
দীপাবলির আগে মিষ্টি, ঘি, দুধ, পনির, শুকনো ফল, ভোজ্য তেল এবং প্যাকেটজাত খাবারের চাহিদা স্বাভাবিক ভাবেই বেড়ে যায়। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, ভেজাল মেশানো কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রির চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন খাদ্য সরবরাহ এবং দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিষেবার প্রসার ঘটায় খাবার সংরক্ষণ ও পরিবহণের ক্ষেত্রেও নজরদারি জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য, খাদ্যপণ্য তৈরি থেকে শুরু করে গুদামজাত করা, পরিবহণ, বিপণন এবং অনলাইনে সরবরাহ—পুরো ব্যবস্থার উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। কোনও প্রতিষ্ঠানের নাম বা জনপ্রিয়তা নয়, খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, অনিরাপদ খাবার বিক্রির ফলে কারও মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্টদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্তত ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার সংস্থান রয়েছে। ফলে দীপাবলির আগে এই অভিযান শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, ক্রেতাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উৎসবের মরসুমে বাজারে কেনাকাটা কিংবা অনলাইনে খাবার অর্ডার করার সময় ক্রেতাদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন। প্যাকেটজাত খাবারের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, প্যাকেটের সিল এবং এফএসএসএআই-এর লাইসেন্স নম্বর দেখে কেনাকাটা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হওয়া মিষ্টি, ঘি বা দুগ্ধজাত খাবার কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের এই অভিযান স্পষ্ট করে দিল, উৎসবের বাজারে বিক্রির পরিমাণ বাড়লেও খাদ্য সুরক্ষার নিয়মে কোনও শিথিলতা বরদাস্ত করতে রাজি নয় প্রশাসন। জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এই বার্তাই দিতে চাইছে রাজ্য সরকার।




