ওয়াশিংটন ও তেহরান: আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত ফের তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিল ইরান। নতুন করে মার্কিন হামলা হলে প্রত্যাঘাতের ক্ষেত্রে কোনও ভৌগোলিক সীমারেখা মানা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরানের সেনাবাহিনী। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো নিশানা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মহম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অভিজ্ঞতা বেড়েছে। আগের তুলনায় তারা এখন অনেক বেশি প্রস্তুত এবং আত্মবিশ্বাসী। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের নির্দেশে যে কোনও হামলার জবাব দেওয়া হবে। সেই প্রত্যাঘাত হবে দ্রুত, কার্যকর এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে।
ইরানের এই হুঁশিয়ারির অর্থ, সংঘাত ফের শুরু হলে তা শুধু ইরান, ইজরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে আটকে নাও থাকতে পারে। আমেরিকার এমন সামরিক ঘাঁটিও নিশানায় আসতে পারে, যেগুলি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অবস্থিত। এর আগে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাধিক বার জানিয়েছে, তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। তাতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বার্তা
ইরানের এই হুঁশিয়ারির নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। শুক্রবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান নিয়ে ফের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন হলে আমেরিকা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাঁর কথায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় বেশি অস্ত্র তৈরি করছে। ইরান প্রসঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করার জন্য আমেরিকা ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’।
তবে একই সঙ্গে ইরানে ফের বড় আকারের হামলা চালানো নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তাও প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, সম্ভব হলে ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করতে চান না। কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করলে সেই পদক্ষেপও করতে হতে পারে। এর আগে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একাধিক বার কড়া অবস্থান জানিয়েছেন তিনি। তেহরানকে কোনও ভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না বলেও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা ও ইজরায়েল যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তা প্রয়োজনীয় ছিল। একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানিয়েছেন। অন্য দিকে, ইরানের দাবি, সামরিক চাপ দিয়ে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না।
কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণ, ফের হামলার দাবি ট্রাম্পের
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানে সীমিত সামরিক হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানের একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। ওই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর কাছে কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দু’টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। তবে বিস্ফোরণে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেশম দ্বীপের অবস্থান কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এই দ্বীপের আশপাশ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং সমুদ্রপথের বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
হরমুজ খুলতে সাত শর্ত ইরানের
অন্য দিকে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিক ভাবে খুলে দেওয়ার প্রশ্নেও অনড় অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নিলেই এই জলপথ খুলে দেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি সম্ভব। ইরানের দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে সমাধান।
হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজ পরিবহণের খরচ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের কাছেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতায় কাতার
সামরিক হুঁশিয়ারির পাশাপাশি কূটনৈতিক স্তরেও তৎপরতা চলছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতা করছে কাতার। দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় অগ্রগতি ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের খবর।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি শনিবার জানিয়েছেন, সংঘাত এড়াতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর দাবি, আমেরিকা এখনও সমঝোতায় পৌঁছতে আগ্রহী এবং আলোচনায় অগ্রগতিও হয়েছে। তবে নিখুঁত চুক্তির অপেক্ষায় না থেকে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।
আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও গত দু’সপ্তাহ ধরে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। কাতারের মাধ্যমে ইরানের কাছে মার্কিন প্রস্তাব পৌঁছেছে বলেও খবর। তবে দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব এবং হরমুজ প্রণালী, নিষেধাজ্ঞা ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য এখনও বড় বাধা।
ফলে এক দিকে ট্রাম্পের সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে ইরানের ভৌগোলিক সীমাহীন প্রত্যাঘাতের বার্তা—দুইয়ের মধ্যে আটকে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ। কূটনৈতিক আলোচনা সফল না হলে ফেব্রুয়ারি থেকে চলা সংঘাত ফের নতুন মাত্রা পেতে পারে। আর সেই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়ালে তার অভিঘাত পড়তে পারে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে।




