কলকাতা: ডাইনোসর মানেই কি হিংস্র মাংসাশী প্রাণী? ধারালো দাঁত, শক্তিশালী চোয়াল আর শিকার ধরে খাওয়ার ভয়ংকর ক্ষমতা—এত দিন ডাইনোসর সম্পর্কে এমন ধারণাই ছিল সাধারণ মানুষের। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার সেই প্রচলিত ধারণায় নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে এমন এক ডাইনোসর বাস করত, যার পছন্দের খাবার ছিল মাংস নয়, ফল! নাম ‘ইনফার্নোগ্যালাস জেমসি’ (Infernogallus jamesi)। বিজ্ঞানীরা যার ডাকনাম দিয়েছেন ‘হেল চিকেন’। দেখতে অনেকটা বড়সড় মুরগি বা টিয়ার মতো হলেও খাবারের তালিকায় ছিল বেরি, পিচের মতো ফল এবং নরম উদ্ভিজ্জ খাবার।
গবেষকদের এই আবিষ্কার ডাইনোসরদের খাদ্যাভ্যাস এবং বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ। স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়, রয়্যাল অন্টারিও মিউজিয়াম এবং নর্থ ডাকোটা জিওলজিক্যাল সার্ভের গবেষকেরা যৌথ ভাবে এই গবেষণা চালিয়েছেন।
কেন নাম ‘হেল চিকেন’?
এই ডাইনোসরের নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তার আবিষ্কারের ইতিহাস। আমেরিকার মন্টানা, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা এবং ওয়াইয়োমিং জুড়ে বিস্তৃত ‘হেল ক্রিক ফরমেশন’ এলাকায় এর জীবাশ্মের সন্ধান মিলেছে। সেই জায়গার নাম থেকেই ‘হেল চিকেন’ নামটির উৎপত্তি। বৈজ্ঞানিক নাম ইনফার্নোগ্যালাসের অর্থও মোটামুটি ‘নরকের মুরগি’।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ পর্যায়ে পৃথিবীতে বাস করত এই প্রাণী। দৈর্ঘ্যে প্রায় পাঁচ ফুট এবং ওজনে ১১-১২ কিলোগ্রামের মতো ছিল সে। অর্থাৎ আকারে অনেকটা বড়সড় টার্কির সমান। দু’পায়ে হাঁটতে পারত। দাঁতের বদলে ছিল শক্ত ঠোঁটের মতো মুখের গঠন। গবেষকদের অনুমান, শরীর পালকে ঢাকা থাকত।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই ছোটখাটো ডাইনোসরটির প্রতিবেশী ছিল পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর শিকারি টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স। একই এলাকায় ঘুরে বেড়াত ট্রাইসেরাটপস এবং অ্যানকাইলোসরাসের মতো ডাইনোসরও। অথচ তাদের মতো মাংসের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোর বদলে হেল চিকেনের আগ্রহ ছিল ফলমূলের দিকে।
চোয়ালের বিশেষ গঠনেই ধরা পড়ল ফল খাওয়ার রহস্য
কী ভাবে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন যে এই ডাইনোসর মাংস নয়, ফল খেত? তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে খুলির গঠন এবং চোয়ালের পেশিতে। গবেষকেরা জীবাশ্মের খুলির সিটি স্ক্যান করে তার চোয়ালের গঠন পুনর্নির্মাণ করেন। তাতে দেখা যায়, হেল চিকেনের চোয়ালের পেশি ছিল অত্যন্ত বিশেষ ধরনের। সাধারণ মাংসাশী ডাইনোসরদের মতো শুধু উপর-নীচে চোয়াল চালিয়ে খাবার কামড়ানোর পরিবর্তে সে সামনের দিকে এবং পিছনের দিকে চোয়াল নাড়াতে পারত।
এই বিশেষ ক্ষমতার ফলে ফলের নরম শাঁস চিবিয়ে খাওয়া এবং তার ভিতরের বীজ আলাদা করা সম্ভব হত। শুধু চোয়ালের পেশিই নয়, তার ঠোঁটের গায়েও ছিল বিশেষ খাঁজ এবং উঁচু-নিচু অংশ। সেগুলি ফল কাটা, পেষা এবং নরম উদ্ভিজ্জ খাবার প্রক্রিয়াকরণে সাহায্য করত। গবেষকদের মতে, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে পাওয়া অত্যন্ত বিরল। আধুনিক পৃথিবীতে কিছু ফলখেকো পাখি এবং কচ্ছপের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলির কয়েকটি আলাদা ভাবে দেখা যায়। কিন্তু একই প্রাণীর মধ্যে এমন সমন্বয় আগে দেখা যায়নি।
গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক এবং স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রেগরি ফানস্টনের মতে, ক্রিটেশিয়াস যুগে ডাইনোসররা যে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত ভূমিকা পালন করত, তা বিজ্ঞানীদের জানা ছিল। কিন্তু কোনও ডাইনোসর যে বিশেষ ভাবে ফল খাওয়ার জন্য এমন চোয়াল তৈরি করেছিল, তা তাঁদের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল।
টি-রেক্সের আত্মীয় হয়েও মাংস ছেড়ে ফলের দিকে ঝোঁক!
বিবর্তনের ইতিহাসেও এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হেল চিকেন এমন একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের পূর্বপুরুষরা ছিল মাংসাশী থেরোপড ডাইনোসর। এই গোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছে টি-রেক্সের মতো ভয়ংকর শিকারি। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় একই বৃহত্তর গোষ্ঠীর কিছু সদস্য সম্পূর্ণ ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলেছিল।
সাধারণত তৃণভোজী ডাইনোসরদের খাবার হজমের সুবিধার জন্য পেটে পাথর গিলে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই পাথর খাবার পিষে হজমে সাহায্য করত। কিন্তু হেল চিকেনের ক্ষেত্রে গবেষকেরা পেয়েছেন চিবিয়ে খাবার প্রক্রিয়াকরণের বিশেষ ব্যবস্থা। অর্থাৎ খাবার সরাসরি মুখের মধ্যেই পিষে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার।
ঠিক কোন কোন ফল সে খেত, তা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে গবেষকদের অনুমান, তার খাদ্যতালিকায় বেরি জাতীয় ফল এবং শক্ত বীজযুক্ত ফল থাকতে পারে। বর্তমান পৃথিবীতে পিচ, চেরি, আম এবং জলপাইয়ের মতো ফল এই ধরনের ফলের উদাহরণ।
গাছের বংশবিস্তারেও ভূমিকা ছিল ডাইনোসরের?
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু ডাইনোসরের খাদ্যাভ্যাস নয়, বরং ফুল ও ফলের বিবর্তনের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সম্পর্ক। ক্রিটেশিয়াস যুগে পৃথিবীতে ফুলধারী উদ্ভিদের বিস্তার দ্রুত বাড়ছিল। প্রায় ১৩-১৪ কোটি বছর আগে এই ধরনের উদ্ভিদের আবির্ভাব ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংখ্যা এবং বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে। তৈরি হতে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফল।
গবেষকদের ধারণা, ফল খাওয়ার পরে হেল চিকেনের মতো ডাইনোসররা অন্য জায়গায় বীজ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে থাকতে পারে। বর্তমানে পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং বিভিন্ন সরীসৃপ এই কাজ করে। ফলে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে হেল চিকেনও ঠিক একই ভাবে ফুলধারী উদ্ভিদের বিস্তারে কতটা সাহায্য করেছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এই বিষয়ে আরও জীবাশ্ম এবং প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। সব মিলিয়ে, ‘হেল চিকেন’-এর আবিষ্কার ডাইনোসরদের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করল।
এত দিন যে যুগকে মূলত মাংসাশী দৈত্যদের রাজত্ব বলে মনে করা হত, সেই যুগেই যে ফল খাওয়ার জন্য বিশেষ ভাবে অভিযোজিত ডাইনোসরও বাস করত, তা স্পষ্ট হল নতুন গবেষণায়। টি-রেক্সের মতো ভয়ংকর শিকারির পাশে দিব্যি ফল খেয়ে দিন কাটানো এই ছোট্ট ডাইনোসর যেন মনে করিয়ে দিল, প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর জীবনযাত্রা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল।




