ওয়াশিংটন : ইরান যুদ্ধের আঁচ এ বার সরাসরি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুললেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর দাবি, ইরানের সঙ্গে সংঘাতই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচে চাপ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে আসার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্পের বহু পুরনো সমর্থক। ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফের খোঁচা, আমেরিকায় যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, তখন ‘বস’ অর্থাৎ ট্রাম্প পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্য দিকে, নির্বাচনে ধাক্কা খেলেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে নারাজ ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের অন্দরে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রশাসনের একাংশের মত, আরও এক দফা হামলা চালিয়ে তার পর শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। আবার অন্য একটি অংশ চাইছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা মাথায় রেখে দ্রুত যুদ্ধের ইতি টানতে। ফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরেই মতবিরোধ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে।
‘পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ’, বিস্ফোরক ভ্যান্স
৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি সভা, দু’টিরই নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। একাধিক রিপাবলিকান ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।এই ফলাফলের পর বুধবার সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট করেন ভ্যান্স। সেখানে তিনি কার্যত স্বীকার করে নেন, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তের জন্যই ভোটারদের বড় অংশ রিপাবলিকানদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’’
ভ্যান্সের মতে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যাঁরা ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এ বার ভোট দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু রিপাবলিকানদের পক্ষে নয়। যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া জ্বালানির দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ভোটারদের আস্থা ফেরাতে চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভ্যান্স। প্রথমত, ইরান যুদ্ধের অবসান। দ্বিতীয়ত, মূল্যবৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ নিয়ন্ত্রণ। তৃতীয়ত, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ফিরে যাওয়া। চতুর্থত, ইজরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন।
ভ্যান্সের বক্তব্য, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য কতটা, তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ছ’বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেই মূল্য দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তার জবাব প্রশাসনকে দিতে হবে।
‘পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বস’, ট্রাম্পকে কটাক্ষ ইরানের
ভ্যান্সের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আমেরিকাকে আক্রমণের সুযোগ ছাড়েনি ইরান। বৃহস্পতিবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ সমাজমাধ্যমে ভ্যান্সের পোস্টের জবাব দেন। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘হেরে যাওয়া জুয়াড়ির মতো অবস্থা। খেলার টেবিল ছেড়ে উঠতেও পারছেন না।’’
এর পরেই ট্রাম্পকে নিশানা করে গালিবাফের মন্তব্য, ‘‘বস যখন যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আমেরিকা ইজরায়েলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার খাদের দিকে এগোচ্ছে। এত বড় বক্তৃতা না দিয়ে নিজের বসকে এই কথাগুলি বলুন না কেন?’’
ইরানের বক্তব্য, আমেরিকার প্রশাসন যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য স্বীকার করতে চাইছে না। যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইও মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের শত্রুতার নীতিতে বিশেষ পরিবর্তন হবে না। একই সঙ্গে নতুন করে হামলা চালানো হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, ‘ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যায় না’
ভ্যান্সের বক্তব্যে অস্বস্তি তৈরি হলেও যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে এখনও সমর্থন করছেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং তার প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়েছে। তাঁর কথায়, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পিছনে ইরান যুদ্ধ অন্যতম কারণ হতে পারে।
তবে সেই কারণেই সামরিক অভিযান ভুল ছিল, এমনটা মানতে নারাজ ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে এই সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ছিল। এমনকি আবার একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ভালই লেগেছে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের ব্যক্তিগত অবস্থান যে তিনি আগে থেকেই জানেন, সে কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্যান্স প্রার্থী হবেন কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ভবিষ্যতে কে প্রার্থী হবেন, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
হোয়াইট হাউসে মতবিরোধ, প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ঘিরেও প্রশ্ন
ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে মতপার্থক্য নতুন নয়। তবে নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, ইরানের বিরুদ্ধে আরও এক দফা বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে তার পর আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার চেষ্টা করা উচিত। অন্য অংশের মতে, নতুন করে হামলা চালালে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বরং যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এই বিতর্কে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনের কয়েক জনের অভিযোগ, ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছেন হেগসেথ। অন্য দিকে, বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো এবং ভ্যান্স-সহ কয়েক জন আধিকারিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটানোর পক্ষে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই নতুন করে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনা পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে। তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী এবং অতিরিক্ত মেরিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা ওই অঞ্চলে পাঠানো হতে পারে। যদিও প্রকাশ্যে হেগসেথের পাশে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্প। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভাল কাজ করছেন এবং তাঁকে সরানোর কোনও পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই কি কাল হল রিপাবলিকানদের?
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমেরিকার সাধারণ মানুষের উপর।
বিশেষ করে গাড়ির জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছিল। ফলে ট্রাম্পের পুরনো সমর্থকদের একাংশ এ বার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি, প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান এবং ইজরায়েলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে। এক দিকে ভ্যান্সের প্রকাশ্য অসন্তোষ, অন্য দিকে পেন্টাগনের পরবর্তী সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি এবং তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল।




