নয়াদিল্লি, ৫ নভেম্বর: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে ভারতের জন্য বড় স্বস্তির খবর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর বিধিনিষেধ জারি রাখলেও ভারত-সহ চারটি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে সেই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। ভারতের পাশাপাশি চিন, ইরাক এবং কাতারের জাহাজও এই বিশেষ ছাড় পাবে। তেহরানের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদেশনীতি বিষয়ক কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান আমির হায়াত-মোগাদ্দাম। তাঁর দাবি, চারটি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কেন ভারতকে এই বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে ইরান?
ইরানি সাংসদের বক্তব্য, ভারতের জাহাজ চলাচলে সুবিধা দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হল ভারত থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি করা। অন্য দিকে, চিনের জাহাজকে ছাড় দেওয়ার পিছনে রয়েছে বেজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার কৌশল। কাতার ও ইরাকের ক্ষেত্রেও রয়েছে পৃথক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করে। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত নিজের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। তার প্রায় ৩০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথের উপর ভারতের নির্ভরতা আরও বেশি ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া, আমেরিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা করেছে নয়াদিল্লি।
তবে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রেও এই জলপথ ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আমদানি করা এলপিজির প্রায় ৯০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। পাশাপাশি কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অর্ধেকেরও বেশি এই পথের উপর নির্ভরশীল। সার আমদানির ক্ষেত্রেও হরমুজের গুরুত্ব রয়েছে।
ফলে ভারতীয় জাহাজের জন্য এই পথ খুলে যাওয়ার অর্থ শুধু বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, দেশের জ্বালানি সরবরাহ এবং শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বড় স্বস্তি।
ওষুধের বিনিময়ে জাহাজ চলাচলে ছাড়?
ইরানের সাংসদ আমির হায়াত-মোগাদ্দামের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পিছনে রয়েছে ভারতের কাছ থেকে ওষুধ আমদানির প্রয়োজন। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলায় ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ওষুধ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
ভারতের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক কম দামে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন এবং রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের পরিচিতি রয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা তেহরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য দিকে, চিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি কূটনৈতিক। ইরানের বক্তব্য, চিনের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে বেজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে চায় তারা। চিন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও চিনের সমর্থন তেহরানের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ।
জাহাজ চলাচলে কি কোনও মাশুল দিতে হবে?
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। ইরানের সাংসদের দাবি, ভারত ও চিনের জাহাজ থেকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য ট্রানজিট ফি বা যাতায়াতের মাশুল নেওয়া হচ্ছে। তবে কাতারের জাহাজকে বিনা মাশুলে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইরাকের জাহাজের ক্ষেত্রে কোনও মাশুল নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
অন্য দিকে, ভারতীয় সরকারি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বিদেশ মন্ত্রকের আলোচনার মাধ্যমে যে জাহাজগুলির যাতায়াতের অনুমতি আদায় করা হয়েছে, সেগুলির জন্য ভারত সরকার কোনও ট্রানজিট ফি দেয়নি। ফলে ইরানের সাংসদের বক্তব্য এবং ভারতীয় সূত্রের দাবির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় জাহাজের জন্য ছাড়ের সুনির্দিষ্ট শর্ত কী, কত দিন এই সুবিধা কার্যকর থাকবে এবং ভবিষ্যতে কোনও আর্থিক শর্ত আরোপ করা হবে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের জেরে আট মাস ধরে বিপর্যস্ত হরমুজ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র হয়েছে। পাল্টা হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধের প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে তেহরান।
পরে ইরানের বন্দরগুলির উপর নৌ অবরোধ জারি করে আমেরিকাও। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক জাহাজকে বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। কোথাও জাহাজ আটকে পড়ছে, কোথাও নিরাপত্তার কারণে যাত্রা বাতিল করতে হচ্ছে। একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে অগস্টের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর অন্তত ৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন নাবিক। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে।
সোমবার ওমানের লিমাহ উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজ এমএসভি আল ইউসুফিতে হামলায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে বলেও খবর।়
ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানেও বাড়তি গুরুত্ব
শুরু থেকেই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে সওয়াল করে এসেছে নয়াদিল্লি। বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অসামরিক পরিকাঠামোর উপর হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়েছে কেন্দ্র।
হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় জাহাজের জন্য বিশেষ ছাড়ের সিদ্ধান্ত তাই কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছে ভারত।
তবে এই ছাড়কে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অন্যান্য দেশের জাহাজের উপর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। নিরাপত্তার ঝুঁকিও কাটেনি।
সব মিলিয়ে, ভারত, চিন, ইরাক ও কাতারকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কার্যত কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান। এক দিকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা, অন্য দিকে প্রতিপক্ষ দেশগুলির উপর চাপ বজায় রাখা—দুই লক্ষ্যই রয়েছে তেহরানের। ভারতের কাছে এই সিদ্ধান্ত আপাতত স্বস্তির হলেও হরমুজ প্রণালিতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে কি না, তার উপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের জ্বালানি বাজারের বড় অংশ।




