নিউজ ডেস্ক: মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ভোটারদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল সরকারি দুর্নীতি। এ বার সেই দুর্নীতির অভিযোগকেই সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নবশক্তিতে বলীয়ান ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব। তদন্তের জন্য কংগ্রেসের সমন জারি করার ক্ষমতা এবং বাড়তি কর্মী-পরিকাঠামো কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছেন দুই কক্ষের নেতারা। যদিও ট্রাম্প ও তাঁর হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরেই কোনও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর এবং পরিবারের সম্পদ কী ভাবে বেড়েছে, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত তদন্তের পরিকল্পনা করছে। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস, যিনি পরবর্তী স্পিকার হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয় বার অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। কয়েক মাস আগেই জেফ্রিস এই তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি ও বিচারবিভাগীয় কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রবার্ট গার্সিয়া এবং জেমি রাসকিনকে।
নির্বাচনের ফল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যেতে শুরু করতেই গার্সিয়া সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আইনজীবী ঠিক করুন।’ সেনেটেও একই ধরনের তদন্ত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের সেনেটর চাক শুমার, যিনি আগামী বছর ফের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন, বলেছেন, ‘আমেরিকার মানুষ চান, আমরা সরকারের দুর্নীতি পরিষ্কার করি। ট্রাম্প যখন শেয়ার বাজারে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেন করছেন, তখন কোনও আমেরিকানকে সুপারমার্কেটে কেনাকাটার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়।’
নজরদারি ও সরকারি সংস্কার কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গার্সিয়া পাঁচটি অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেন, জেফ্রি এপস্টিন তদন্তে প্রশাসনের ভূমিকা এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই-র অভিযান। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বলরুম-সহ বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প এবং খনিজ সংক্রান্ত চুক্তিতে ট্রাম্প পরিবারের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে চান।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের কমিটিগুলিতে বাড়তি কর্মী ও অর্থ বরাদ্দ হবে। ফলে বিভিন্ন মন্ত্রক এবং সরকারি সংস্থার কাজের উপর নজরদারির ক্ষমতা থাকা কমিটিগুলিকে নিয়ে তদন্তের পরিধি বড় হতে পারে।
সেনেটে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল, যিনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির স্থায়ী তদন্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন, ট্রাম্পের ওয়াশিংটন এলাকার আবাসন প্রকল্প এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তাঁর ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন খতিয়ে দেখতে চান। উইটকফ দীর্ঘদিনের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ এবং প্রেসিডেন্টের পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়াল’-এর অংশীদার।
ব্লুমেন্থাল বলেছেন, ‘দুর্নীতির শিকড় এই প্রশাসনের গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে। এর ফলে সাধারণ আমেরিকানদের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে।’ তিনি আইসিই-র অভিযান, সরকারি দক্ষতা দফতরের (ডিওজিই) কাজ এবং মেডিকেয়ারের এমন কিছু পরিকল্পনা নিয়েও শুনানি চান, যেগুলি তাঁর মতে অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ কমিয়েছে।
সেনেটের অর্থ কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ওরেগনের ডেমোক্র্যাট সেনেটর রন ওয়াইডেনও তদন্তের কয়েকটি ক্ষেত্রের কথা জানিয়েছেন। এপস্টিনের আর্থিক লেনদেনে সন্দেহজনক ইঙ্গিত উপেক্ষা করা ব্যাঙ্ক এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে লাভবান হওয়া ওষুধ সংস্থাগুলি রয়েছে সেই তালিকায়। ওয়াইডেন বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হলে আমেরিকার মানুষের ক্ষতি করা এবং ট্রাম্পের দুর্নীতিকে সাহায্য করার জন্য তাদের সেনেটের অর্থ কমিটির সামনে জবাব দিতে বাধ্য করা হবে।’
মঙ্গলবারের নির্বাচনে এক লক্ষেরও বেশি ভোটারের উপর চালানো এপি ভোটার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সরকারি দুর্নীতি ও গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে বহু মার্কিন ভোটার গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। প্রায় ১০ জনের মধ্যে চার জন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসাবে অর্থনীতিকে চিহ্নিত করেছেন। প্রায় তিন জনের মধ্যে এক জনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘গণতন্ত্রের অবস্থা’।
প্রায় অর্ধেক ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারি দুর্নীতি ছিল ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়। তাঁদের অধিকাংশই স্থানীয় প্রতিনিধি পরিষদের আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। এই ভোটারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। গণতন্ত্রের অবস্থা সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে যাঁরা মনে করেছেন, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটকে সমর্থন করেছেন।
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি ভোটারদের মধ্যে গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ তুলনায় বেশি। তাঁদের প্রায় চার জনের মধ্যে এক জন নয়, বরং চার জনের মধ্যে দু’জনের কাছাকাছি গণতন্ত্রকে দেশের প্রধান সমস্যা বলেছেন—অর্থনীতিকে প্রধান সমস্যা বলেছেন প্রায় তিন জনের মধ্যে এক জন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে ছবিটা উল্টো; তাঁদের কাছে অর্থনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই কারণেই এ বারের নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতিবিরোধী বার্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা অভিযোগ করেছিলেন, রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীরা সাধারণ মানুষের বদলে নিজেদের স্বার্থ এবং অনুদানদাতাদের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, পরিশ্রমী আমেরিকানদের জন্য আরও সাফল্য আনতে তিনি যে কারও সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ডেমোক্র্যাটরা যদি ভুয়ো তদন্ত এবং উগ্র বামপন্থী নীতি বেছে নেন, তা হলে তাঁরা আমেরিকার মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করছেন।’
শুমারের দাবি, দুর্নীতির তদন্তের পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আইন প্রণয়নের কাজ চালাতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। স্পিকার পদে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কাছে চিঠিতে জেফ্রিস লিখেছেন, ‘প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থার মতো কাজ করবে—সেই দিন শেষ।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ট্রাম্প গোষ্ঠীর ব্যাপক দুর্নীতিই ব্যাখ্যা করে, কেন সাধারণ আমেরিকানদের সাহায্য করার জন্য খুব সামান্য কাজ হচ্ছে।’ মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আইনপ্রণেতাদের শেয়ার লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন জেফ্রিস।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুর্নীতির অভিযোগকে ভোটারদের জীবনযাত্রার খরচের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত রাখা। আগে জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান তদন্তের মোকাবিলায় তৈরি হওয়া ‘কংগ্রেশনাল ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্ট’ এ বার ডেমোক্র্যাটদের এই কাজে সাহায্য করতে চাইছে। সংগঠনটির পরামর্শ, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে কারা লাভবান হচ্ছেন, তা খুঁজে বের করতে হবে। সংস্থার উপদেষ্টা জ্যাক মিলার বলেছেন, ‘দুর্নীতি শুধু দুর্নীতি নয়। এর জন্য করদাতাদের টাকা খরচ হচ্ছে, সাধারণ আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবনেও তার প্রভাব পড়ছে।’




