স্পোর্টস ডেস্ক: বয়স যে শুধুই একটা সংখ্যা, আরও এক বার বুঝিয়ে দিলেন বিরাট কোহলি। বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ৩৮ বছরে পা দিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের এই মহাতারকা। কিন্তু তাঁর শরীরী ভাষা, ফিটনেস কিংবা মাঠের মধ্যে ক্ষিপ্রতা দেখলে বয়সের হিসেব মেলানো কঠিন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৯তম বছরে পা রাখার মুখে দাঁড়িয়েও কোহলির মধ্যে কমেনি ক্রিকেটের প্রতি আবেগ, জেদ এবং নিজেকে সেরা জায়গায় রাখার তাগিদ। তাঁর কাছে লক্ষ্য এখনও ১০০ শতাংশ। মাঠে নামলে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়াই যেন জীবনের মন্ত্র।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে কোহলির পারফরম্যান্সই তার প্রমাণ। অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ৫১ বলে ৭৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন তিনি। ভারতের পাঁচ উইকেটে জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। ব্যাট হাতে রান করার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও নজর কেড়েছেন কোহলি। নিউজিল্যান্ডের নাথান স্মিথের ক্যাচ ধরতে তাঁর দুরন্ত ডাইভ বুঝিয়ে দিয়েছে, ৩৮ বছর বয়সেও মাঠে নিজেকে নিংড়ে দিতে পিছপা নন তিনি।
বিশেষ করে ক্যাচটি ধরার পর কোহলির উদ্যাপন ছিল দেখার মতো। পরিচিত ধনুক-তীর ছোড়ার ভঙ্গিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। সতীর্থদের সঙ্গে হাসি-মজাও করেন। সেই মুহূর্তেই যেন ধরা পড়েছে তাঁর ক্রিকেটীয় সত্তার আসল পরিচয়। বয়স বাড়লেও খেলার প্রতি সেই শিশুসুলভ উন্মাদনা একই রকম রয়েছে।
কোহলির অবদান অবশ্য শুধু রান কিংবা রেকর্ডে আটকে নেই। ভারতীয় ক্রিকেটে ফিটনেসের সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার পিছনেও তাঁর বড় ভূমিকা রয়েছে। একটা সময় ভারতীয় ক্রিকেটে ফিটনেসকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হত না। কিন্তু কোহলি নিজের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং অনুশীলনের ধরনে আমূল পরিবর্তন এনে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেন। শুধু নিজের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছেও ফিটনেসকে অপরিহার্য করে তুলেছেন তিনি।
তাঁর এই বদল এক দিনে আসেনি। দীর্ঘ দিনের শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ফলেই আজও এতটা ফিট কোহলি। প্রিয় খাবার থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত অনুশীলন এবং শরীরের যত্ন নেওয়া - সব কিছুতেই রয়েছে তাঁর কঠোর মনোভাব। তাঁর লক্ষ্য শুধু দলের সবচেয়ে ফিট ক্রিকেটার হওয়া ছিল না। নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা অ্যাথলিট হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের ১২ মে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেন কোহলি। ভারতের হয়ে ১৪ বছরের টেস্ট কেরিয়ারের ইতি ঘটে। কিন্তু লাল বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর লড়াই থামেনি। এক দিনের ক্রিকেটে এখনও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ব্যাটে রানও এসেছে ধারাবাহিক ভাবে।
কোহলির ব্যক্তিত্বের আর একটি দিক হল আবেগ প্রকাশে তাঁর কোনও সংকোচ নেই। ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা, সতীর্থদের সাফল্যে উচ্ছ্বাস, স্ত্রী অনুষ্কা শর্মার প্রতি ভালবাসা - সব কিছুই প্রকাশ্যে এসেছে বার বার। শতরান করার পরে বিয়ের আংটিতে চুমু খাওয়া হোক কিংবা বোলারদের উইকেট পাওয়ার পরে নিজের মতো করে উদ্যাপন, কোনও কিছুতেই নিজেকে আড়াল করেননি তিনি।
টেস্ট ক্রিকেটে আগ্রাসন এবং লড়াকু মানসিকতার নতুন পরিচয় তৈরি করেছিলেন কোহলি। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দল বিদেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল। প্রতিটি রান, প্রতিটি উইকেট এবং প্রতিটি ম্যাচকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করেছিলেন তিনি। শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, সতীর্থদের কাছ থেকেও সেরাটা বের করে আনতে চাইতেন। তাই কোহলির জন্মদিন শুধুমাত্র একজন ব্যাটারের বয়স বাড়ার দিন নয়।
ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর দীর্ঘ অবদান, ফিটনেস সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার দিনও। ৩৮ বছর বয়সেও তাঁর মধ্যে যে লড়াই করার ক্ষুধা রয়েছে, অকল্যান্ডের ম্যাচে তা আরও এক বার স্পষ্ট। পরিসংখ্যানের বাইরেও কোহলির সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি কোনও কিছুই অর্ধেক মন দিয়ে করেন না। ক্রিকেট হোক কিংবা জীবন, সব ক্ষেত্রেই নিজের ১০০ শতাংশ দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।




