কোচি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের আঁচ এ বার দক্ষিণ ভারতেও। দিল্লির যন্তর মন্তরের আদলে কেরলের কোচিতে বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। আগামী ৭ নভেম্বর, শনিবার কোচির রাজেন্দ্র ময়দানে আয়োজিত হবে এই বিক্ষোভ।
কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘যন্তর মন্তর অ্যাট কোচি’। স্লোগান, ‘গণতন্ত্র বাঁচাও! এসআইআর বাতিল করো’। বিকেল ৪টে থেকে শুরু হবে এই প্রতিবাদ সভা। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে নিজে এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকার কথা দলের অন্য দুই গুরুত্বপূর্ণ মুখ সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকারও।
বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছে সিজেপি। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ ভোটারদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাঁদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে বহু বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এই প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সংগঠনটি।
দিল্লির আন্দোলনের রেশ এ বার কেরলে
এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই উত্তপ্ত জাতীয় রাজনীতি। দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে সিজেপির সঙ্গে পুলিশের সংঘাতের ঘটনাও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখতেই এই আন্দোলন।
দিল্লিতে আন্দোলন ঘিরে একাধিক নেতা-কর্মীর আটক এবং গ্রেফতারির ঘটনাও বিতর্ক বাড়িয়েছে। অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার মতো সিজেপির পরিচিত মুখদেরও পুলিশের পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়েছে। পরে সৌরভ ও আশুতোষ জেল থেকে মুক্তি পান। তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসেনি সংগঠনটি। এ বার সেই আন্দোলনকে দিল্লির বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই কোচিতে কর্মসূচির আয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন এসআইআর নিয়ে এত বিতর্ক?
নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের পরিচয় ও যোগ্যতা নতুন করে যাচাই করা হয়। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় ভুয়ো, মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা একাধিক জায়গায় থাকা ভোটারদের নাম চিহ্নিত করে তালিকাকে নির্ভুল করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। কিন্তু বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়তে পারেন।
বিশেষত দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক, প্রবীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল করার নামে কোনও যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না। প্রতিটি ভোটারের নাম তালিকায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
আন্দোলনের মঞ্চে অভিজিৎ, সৌরভ ও আশুতোষ
কোচির কর্মসূচিতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দিল্লিতে এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ তিনি। তাঁর সঙ্গে সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার উপস্থিতিও আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে পারে। এর আগে দিল্লিতে আন্দোলন ঘিরে এই তিন নেতাকে আটক করার ঘটনা যথেষ্ট চর্চায় এসেছিল। সৌরভ ও আশুতোষের জেলযাত্রা এবং পরবর্তী মুক্তি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে দিল্লির বাইরে কেরলে তাঁদের উপস্থিতিতে আন্দোলন কতটা সাড়া ফেলে, সে দিকে নজর থাকবে।
সিজেপির এই কর্মসূচি শুধু একটি প্রতিবাদ সভাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আগামী দিনে দেশের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও বিরোধীদের সংঘাতের আবহে কোচির এই কর্মসূচি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করতে চলেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনের প্রতিধ্বনি এ বার কেরলের রাজপথে কতটা জোরালো হয়, আপাতত সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।




