নয়াদিল্লি: দলের নির্দেশ অমান্য করে রাহুল গান্ধীর সভায় হাজির হননি। কারণ, সেই দিনই প্রয়াত কাকার স্মরণসভা বা ত্রয়োদশীর অনুষ্ঠান ছিল। আর তার জেরেই পদ খোয়াতে হল যুব কংগ্রেসের এক সাধারণ সম্পাদককে। শুধু তিনি নন, দিল্লিতে বিরোধী ইন্ডি জোটের সমাবেশে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে দেশজুড়ে সাংগঠনিক শাস্তির মুখে পড়েছেন যুব কংগ্রেসের একাধিক নেতা। এখনও পর্যন্ত সাতটি রাজ্যের অন্তত ১৮৫ জন পদাধিকারীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁদের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চেয়েছে দল। সূত্রের খবর, এই সংখ্যা বেড়ে ৫০০-তে পৌঁছতে পারে।
ঘটনাটি ১ নভেম্বরের। দিল্লির রামলীলা ময়দানে ভোটার তালিকায় কারচুপি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী ইন্ডি জোটের সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ বিরোধী শিবিরের একাধিক শীর্ষ নেতা। ওই সমাবেশে যুব কংগ্রেসের সর্বস্তরের পদাধিকারীদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু নির্দেশ সত্ত্বেও যাঁরা হাজির হননি, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
কাকার ত্রয়োদশী, তবু রেহাই নেই!
শাস্তির মুখে পড়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক রোহিত রাজোরিয়া। তাঁর দাবি, কাকার মৃত্যুর কারণে দিল্লির সভায় যেতে পারেননি তিনি। বিষয়টি আগেই দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি তাঁর। এমনকি প্রয়াত কাকার স্মরণসভার আমন্ত্রণপত্রও দেখিয়েছেন তিনি।
রোহিতের অভিযোগ, যুব কংগ্রেসে প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। দলের আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৫টি এফআইআরের মুখোমুখি হয়েছেন এবং তিন-চার বার জেলেও যেতে হয়েছে। অথচ একটি কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকার কারণে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, দলের জন্য এত বছর কাজ করার পরেও কি একটি কর্মসূচিতে অনুপস্থিতির জন্য এমন শাস্তি প্রাপ্য?
সাত রাজ্যে ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সংবাদ সংস্থা সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত সাতটি রাজ্যে অন্তত ১৮৫ জন যুব কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম মধ্যপ্রদেশের। সেখানে ৬০ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। গুজরাতে ৪৯ জন, পশ্চিমবঙ্গে ২৬ জন, তেলঙ্গানায় ১৪ জন, উত্তরপ্রদেশের কেন্দ্রীয় অংশে ১৩ জন, হিমাচলপ্রদেশে ১৩ জন এবং হরিয়ানায় ১০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, অনুপস্থিত নেতাদের তালিকা আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে শাস্তির আওতায় আসতে পারেন আরও অনেকে। সংখ্যাটি ৫০০ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
উপস্থিতি যাচাইয়ে বারকোড, বিশেষ অ্যাপ
দিল্লির সমাবেশে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে অভিনব পদ্ধতি নিয়েছিল যুব কংগ্রেস। মিণ্টো রোডে সমাবেশের আগে জমায়েতের জায়গায় বসানো হয়েছিল বারকোড স্ক্যানার। 'With IYC' নামে সংগঠনের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উপস্থিতি নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পদাধিকারীদের।
যুব কংগ্রেসের দাবি, মিণ্টো রোড থেকে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মিছিল করে রামলীলা ময়দানে যাওয়ার জন্য প্রায় ১৫ হাজার কর্মী জমায়েত হয়েছিলেন। কিন্তু অ্যাপে উপস্থিতি নথিভুক্ত করেন মাত্র ২৮৩১ জন। পরে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইন্টারনেটের দুর্বল সংযোগ, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং কর্মীদের অনীহার কারণে অনেকেই অ্যাপে উপস্থিতি নথিভুক্ত করতে পারেননি। তবে বহু পদাধিকারী কোনও আগাম কারণ না জানিয়েই কর্মসূচিতে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ।
কী বলছে যুব কংগ্রেস নেতৃত্ব?
সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতি উদয় ভানু চিবের বক্তব্য, দিল্লির সমাবেশ অত্যন্ত সফল হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রায় ১৫ হাজার যুব কংগ্রেস কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কিছু পদাধিকারী সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখেননি। তাই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিবের কথায়, দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতাদের সরিয়ে দিয়ে সক্রিয় ও পরিশ্রমী কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
আগামী দিনে দিল্লিতে ৫০ হাজার কর্মী জমায়েত করার লক্ষ্যও নিয়েছে সংগঠন। এ দিকে, মূল কংগ্রেস সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতি নিয়েও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। দলের ওয়ার রুম বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে 'সংগঠন সৃজন অভিযান'-এর মাধ্যমে নিযুক্ত জেলা সভাপতিদের কর্মদক্ষতা এবং সমাবেশে তাঁদের উপস্থিতির বিষয়টিও পর্যালোচনায় রয়েছে।
জমায়েত নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির তরজা
১ নভেম্বরের সমাবেশের উপস্থিতি নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কংগ্রেসের তরফে বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েতের দাবি করা হলেও বিজেপি সেই দাবি খারিজ করেছে। বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্রের দাবি, রামলীলা ময়দানের প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা ছিল। ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েতের কথা বলা হলেও প্রায় ২৮ হাজার চেয়ারের মধ্যে ৫ থেকে ৭ হাজার চেয়ার খালি ছিল বলে দাবি তাঁর।
ওই সমাবেশে রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশন এবং ইভিএমের মাধ্যমে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তাঁকে পদ থেকে সরানোর দাবিও জানান তিনি। উপস্থিত ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব এবং ফারুক আবদুল্লার মতো বিরোধী নেতারা।
সব মিলিয়ে, বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলে যে সমাবেশের আয়োজন করেছিল বিরোধী ইন্ডি জোট, সেই কর্মসূচিতে অনুপস্থিতি ঘিরেই এবার অস্বস্তিতে কংগ্রেসের যুব সংগঠন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কড়া অবস্থান নিয়েছে নেতৃত্ব। কিন্তু পারিবারিক শোক কিংবা ব্যক্তিগত জরুরি পরিস্থিতির কারণে অনুপস্থিত নেতাদের বিরুদ্ধেও একই ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।




