নয়াদিল্লি: কর্মক্ষেত্রে কাজের সময় কি শুধু অফিসের ঘড়ি মেনেই চলবে, নাকি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করলে অন্য দেশের সহকর্মীদের সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনও বিসর্জন দিতে হবে? এই প্রশ্ন তুলে সমাজমাধ্যমে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এক ভারতীয় কর্মী। আমেরিকার সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের সময় মেলাতে গিয়ে কী ভাবে তাঁর কর্মদিবস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে, সেই অভিজ্ঞতাই রেডিটে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।
ওই কর্মীর বক্তব্য, আগে তাঁদের প্রতিদিনের বৈঠক হত সকালবেলায়। পরে আমেরিকায় কর্মরত এক সহকর্মীর সুবিধার কথা মাথায় রেখে বৈঠকের সময় বদলে সন্ধ্যা ৬টা করা হয়। কিন্তু আমেরিকায় ডেলাইট সেভিং টাইম শুরু হওয়ার পর সেই বৈঠকই পিছিয়ে সন্ধ্যা ৭টায় চলে গিয়েছে। ফলে সকাল ৮টা বা ৯টায় কাজ শুরু করার পর সারাদিনের দায়িত্ব সামলে সন্ধ্যাতেও বৈঠকে যোগ দিতে হচ্ছে ভারতীয় কর্মীদের।
তাঁর কথায়, সন্ধ্যা ৭টা বা সাড়ে ৭টার বৈঠক শেষ হতে হতে দিনের অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। ব্যক্তিগত কাজ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও কার্যত থাকছে না। অথচ এই সময়সূচি নিয়ে দুই দেশের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের কোনও বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি।
ওই কর্মীর প্রস্তাব, সপ্তাহের কয়েক দিন বৈঠক সন্ধ্যায় হলে অন্য কয়েক দিন তা আমেরিকার সহকর্মীদের সকালবেলায় রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে দুই পক্ষকেই কিছুটা করে সমন্বয় করতে হবে। এমনকি বুধবার আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না থাকলে সেদিনের বৈঠক বাতিল করার কথাও বলেছেন তিনি।
বিতর্কের অন্যতম কারণ, ওই কর্মীর দাবি অনুযায়ী, আমেরিকার সহকর্মীরা স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার মধ্যেই সাধারণত কাজ শেষ করে দেন। তার পরে তাঁদের বার্তা পাঠালে অনেক ক্ষেত্রেই পরের দিন উত্তর মেলে। তাঁদের ব্যক্তিগত সময়কে সম্মান জানানো হয়। কিন্তু একই নিয়ম ভারতীয় কর্মীদের ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য হবে না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার সহকর্মীদের ব্যক্তিগত সময়ের গুরুত্ব থাকলে ভারতীয় কর্মীদের সন্ধ্যা এবং অবসরও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
সমাজমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
রেডিটে পোস্টটি ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে ভারতীয় কর্মীদের তুলনায় বিদেশি কর্মীদের সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর পিছনে আউটসোর্সিং এবং কম খরচে কাজ করানোর প্রবণতাকেও দায়ী করেছেন কেউ কেউ। তাঁদের বক্তব্য, ভারতীয় কর্মীদের কম খরচের শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা হয় বলেই অনেক ক্ষেত্রে কাজের সময় ও দায়িত্বের ভার তাঁদের উপর বেশি চাপানো হয়।
আবার এক ব্যবহারকারী নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন, তাঁর সংস্থায় আমেরিকার এক সহকর্মী ভারতীয় দলের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ভোর ৪টে বা ৫টায় কাজে যোগ দেন। অন্য দিকে, ভারতীয় কর্মী তুলনায় দেরিতে কাজ শুরু করেন। ফলে সময়ের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাঁর মতে, বিষয়টি একতরফা নয়, বরং সংস্থার কাজের ধরন এবং দলের মধ্যে সমঝোতার উপর নির্ভর করে।
অন্য এক ব্যবহারকারী অবশ্য পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন, সংস্থা যখন নির্দিষ্ট সময়ের পরিষেবা দেওয়ার চুক্তি করে, তখন কর্মীদের সেই শর্ত মেনেই কাজ করতে হয়। তাই বিষয়টিকে একতরফা শোষণ হিসেবে দেখার আগে সংস্থার চুক্তি এবং কাজের শর্তও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, একটি বৈঠকের সময় বদলকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করা ভারতীয় কর্মীদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের প্রশ্ন। সময়ের পার্থক্য মেনে কাজ করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই দায়িত্ব কি সব সময় এক পক্ষের উপরই বর্তাবে? সমাজমাধ্যমের আলোচনায় এখন ঘুরেফিরে উঠছে সেই প্রশ্নই।




