নয়াদিল্লি: মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে সদ্যোজাতকে ঘিরে। এমন সময়েই আচমকা ই-মেলে এল চাকরি হারানোর খবর। যে সংস্থায় কাজ করাকে একসময় স্বপ্নপূরণ বলে মনে হয়েছিল, সেখান থেকেই বিদায়ের বার্তা। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ, হতাশা কিংবা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরই শোনা যায়। কিন্তু ব্যতিক্রমী পথে হাঁটলেন শ্রদ্ধা খুলে। চাকরি হারিয়েও নিজের সংস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন না তিনি। বরং কঠিন সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংস্থার প্রশংসা করলেন। তাঁর সেই আবেগঘন ভিডিয়োই এখন ভাইরাল সমাজমাধ্যমে।
https://www.instagram.com/reel/DfVO9IjRP3-/?utm_source=ig_web_copy_link&srtk=NTc4MTIwNjQ2YQ==
শ্রদ্ধা কাজ করতেন অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ডিজিটাল ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম ক্যানভায়। ২০২৩ সালে সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি ক্যানভার কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তে তাঁর পদটিও প্রভাবিত হয়েছে। অর্থাৎ, সংস্থার সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের জেরে চাকরি হারিয়েছেন শ্রদ্ধা। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ভিডিয়োয় তিনি জানিয়েছেন, ক্যানভায় কাজ পাওয়া ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তাই চাকরি হারানোর খবর পাওয়ার পর প্রথমে কী করবেন, বুঝতেই পারছিলেন না।
শ্রদ্ধার কথায়, ‘‘আজ ক্যানভায় আমার চাকরি চলে গেল। এখনও বিষয়টা ঠিকমতো মেনে নিতে পারছি না। ২০২৩ সালে এই সংস্থায় যোগ দিয়েছিলাম। ক্যানভা এমন একটা জায়গা ছিল, যেখানে কাজ করার স্বপ্ন দেখতাম। সেখানে চাকরি পাওয়া আমার কাছে স্বপ্নপূরণের মতো ছিল। কিন্তু যখন ই-মেলে জানানো হল, আমার পদটি আর থাকছে না, তখন সত্যিই কী ভাবব বুঝতে পারিনি।’’
চাকরি গেল, তবু সংস্থার প্রশংসা!
শ্রদ্ধার ভিডিয়োর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। চাকরি হারানোর পরেও ক্যানভাকে অন্যদের কাজ করার জন্য সুপারিশ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, গত সাড়ে তিন বছর তাঁর পেশাগত জীবনের অন্যতম সেরা সময়। ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও যেভাবে কর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি সামলেছে সংস্থা, তা প্রশংসার যোগ্য।
শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও নেই। তা সত্ত্বেও ছুটি বাড়ানোর প্রয়োজন হলে সংস্থার তরফে সহযোগিতা পেয়েছেন। নিজের ম্যানেজার এবং কোচকে স্ল্যাকে একটি বার্তা পাঠিয়েই কয়েক মাসের জন্য ছুটি বাড়িয়ে নিতে পেরেছিলেন। তাঁর কথায়, কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনকে ক্যানভা যে গুরুত্ব দিয়েছে, তা তিনি ভুলবেন না।
১২৭১ কর্মীর পদে কোপ, কেন এই সিদ্ধান্ত?
উল্লেখ্য, ক্যানভা সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। সংস্থার মোট ১২৭১ জন কর্মী, অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ কর্মীর উপর এই পুনর্গঠনের প্রভাব পড়বে। তবে এর মধ্যে শুধু চাকরি ছাঁটাই নয়, কিছু কর্মীর পদ পরিবর্তন এবং অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ও রয়েছে।
সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মেলানি পারকিন্স কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় জানিয়েছেন, এক দশকের মধ্যে প্রথমবার ক্যানভার বৃদ্ধির গতি কমেছে। সেই পরিস্থিতিতে সংস্থাকে আরও ছোট, দক্ষ এবং ক্ষমতাসম্পন্ন দলে ভাগ করে কাজের ধরন বদলাতে চাইছে কর্তৃপক্ষ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোও এই পুনর্গঠনের অন্যতম লক্ষ্য।
চাকরি হারালেও কর্মীদের জন্য একাধিক সুবিধা
ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কর্মীদের জন্য আর্থিক ও পেশাগত সহায়তার ব্যবস্থাও করেছে ক্যানভা। সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী, চাকরি হারানো কর্মীরা অন্তত ছ’মাসের বেতনের সমপরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি সংস্থার দেওয়া ম্যাকবুক নিজেদের কাছে রাখার সুযোগও থাকছে।
এ ছাড়াও রয়েছে ছ’মাসের লিঙ্কডইন প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন, চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে পরামর্শ, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি এবং সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য। যে দেশগুলিতে সংস্থা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দেয়, সেখানে যোগ্য কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা চালু রাখার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যাঁরা চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসা কিংবা নতুন কোনও সামাজিক উদ্যোগ শুরু করতে চান, তাঁদের জন্য রয়েছে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত অনুদানের সুযোগ। পাশাপাশি প্রাক্তন কর্মীদের নিয়ে একটি বিশেষ ট্যালেন্ট ডিরেক্টরি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। বিনিয়োগকারী, সহযোগী সংস্থা এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে সেই তালিকা পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে প্রাক্তন কর্মীরা নতুন কাজের সুযোগ পান।
সমাজমাধ্যমে প্রশংসা, উঠল কর্মী-সংস্কৃতির প্রশ্ন
শ্রদ্ধার ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা করেছেন। কেউ দ্রুত নতুন চাকরি পাওয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, কেউ আবার নিজের ছাঁটাইয়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। ক্যানভার কর্মী ছাঁটাইয়ের পদ্ধতি এবং বিদায়ী কর্মীদের জন্য ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে এই ঘটনা প্রযুক্তি শিল্পে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতির ফলে একাধিক সংস্থায় কাজের ধরন বদলাচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে কর্মী নিয়োগ এবং পুরনো পদগুলির অস্তিত্বের উপরেও।
শ্রদ্ধার অভিজ্ঞতা তাই শুধু এক মহিলার চাকরি হারানোর গল্প নয়। মাতৃত্ব, পেশাগত জীবন এবং কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে এক কর্মীর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছে। চাকরি হারানোর দুঃখ থাকলেও, বিদায়ের মুহূর্তে পাওয়া সহযোগিতা ও সম্মান যে কোনও কর্মীর কাছেই কতটা গুরুত্বপূর্ণ, শ্রদ্ধার ভিডিয়োতে যেন সেই বার্তাই উঠে এসেছে।




