হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো রোগ শনাক্ত করতে দেরি করা, সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি। বিশেষ করে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
সম্প্রতি প্রকাশিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকদের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এসব বিষয় উঠে এসেছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রাণঘাতী এ মশাবাহিত রোগে চলতি বছর দেশে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ৪শ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৬ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সচেতনতা, বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সাতজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫২ জনে। এর মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগে, তিনজন চট্টগ্রাম বিভাগে এবং একজন খুলনা বিভাগে মারা গেছেন। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭১ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩৯ জন রোগী। তবে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ভয়াবহ রূপ নেয়। সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হলেও অক্টোবরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮১ জন।
নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কথা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এইচ এম নজমুল আহসান এর সঙ্গে। তিনি জানান, অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায়।
কারও কারও রক্তচাপ শনাক্ত করা যাচ্ছে না, আবার কারও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রাও কমে যাচ্ছে। ডেঙ্গু শকে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে পারলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু চিকিৎসায় দেরি হলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর কারণে শুধু রক্তক্ষরণ নয়, লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রেও গুরুতর জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে মায়োকার্ডাইটিস বা হৃদযন্ত্রের পেশিতে প্রদাহ তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই জ্বর ও শরীর ব্যথা দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে কাজ করছে। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে-জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে করে অনেকে বাড়িতে বসে থাকছেন। হাসপাতালে আসতে দেরি হওয়ায় রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। তারা বলছেন, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরবর্তী সংক্রমণে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে। একইসঙ্গে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে গিয়ে রক্তচাপ কমে যায়। ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। পরিবহন, জরুরি বিভাগে মূল্যায়ন ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় দেরি হলেও চিকিৎসা শুরু করতে সময় লেগে যায়।
ডেঙ্গু যেন এখন শুধু একটি রোগের নাম নয়, বহু পরিবারের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম। পরিবারের একজন সদস্য আক্রান্ত হলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের মধ্যেও। হাসপাতালে শয্যা পাওয়া, প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষা, প্লাটিলেট কমে যাওয়া, চিকিৎসার ব্যয় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি—সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন স্বজনরা। কারও পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত, আবার কোনো পরিবার হারিয়েছে প্রিয় সন্তানকে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢামেকসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগ ও অসহায়ত্বের চিত্র।
রাজধানীর পীরেরবাগ এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ শুক্কুর আলীর ১২ বছর বয়সী ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। ছেলের প্লাটিলেট কমে ১৬ হাজারে নেমে যাওয়ায় ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। শুক্কুর আলী বলেন, প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাঁরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। ছেলের মাও কান্নাকাটি শুরু করেছিলেন। পরে চিকিৎসার মাধ্যমে প্লাটিলেট বাড়তে থাকলে পরিবারে স্বস্তি ফিরে আসে। একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন রাজধানীর ১৯ মাস বয়সী শিশু আয়াশের মা আনিকা তাহেরা। শিশুটিকে নিয়ে তিনটি হাসপাতাল ঘুরতে হয়েছে তাঁদের। কোনো হাসপাতালেই সহজে শয্যা পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে শিশুটির মাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ফলে মা ও শিশুর চিকিৎসা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
শুধু হাসপাতালে শয্যা পাওয়াই নয়, চিকিৎসার খরচ নিয়েও বিপাকে পড়ছেন অনেক পরিবার। ঢাকার বাইরে থেকে আসা স্বজনদের থাকতে হচ্ছে হাসপাতালেই। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। খুলনার সৃজন কুণ্ডুর পরিবারের অভিজ্ঞতাও একই রকম। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে একাধিক হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন স্বজনরা। কিন্তু শয্যা না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা চালাতে হয়। তাঁর মা লিপিকা কুণ্ডু বলেন, বাসায় নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো কঠিন। হাসপাতালে থাকলে চিকিৎসকদের কাছ থেকে দ্রুত পরামর্শ পাওয়া যায়। কিন্তু শয্যা না থাকায় ছেলেকে বাসায় রেখেই চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ,অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে ভোগান্তি হচ্ছে। রোগী সাঈদ হোসেন জানান, পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা পেতেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা যাঁদের, তাঁদের অনেকেই হারিয়েছেন পরিবারের প্রিয় সন্তানকে। ঢাকার এক পরিবারের দুই ছেলে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে মারা গেছে। ১৬ বছর বয়সী ছোট ছেলে ইনতিসার হাসান ইয়াস এবং ২৪ বছর বয়সী বড় ছেলে নাজমুল হাসান ইফতির মৃত্যুতে পরিবারটি শোকে ভেঙে পড়েছে।
তাঁদের মা নাজমিন আক্তার বলেন, একটি ছোট্ট মশা আমার পরিবারের সব সুখ কেড়ে নিয়েছে। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মতো আর কিছুই আমাদের নেই। এমন অভিজ্ঞতা ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য শুধু চিকিৎসার সংকট নয়, বরং মানসিক ও আর্থিক লড়াইয়েরও প্রতিচ্ছবি। স্বজনদের প্রত্যাশা, হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁদের ভাষায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে এক অজানা আতঙ্কে। কখন রোগীর অবস্থা খারাপ হয়, কখন হাসপাতালে নিতে হয়—এই দুশ্চিন্তাই এখন বহু পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। একইসঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং ডেঙ্গুকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তি নিশ্চিত করাই পারে অনেক প্রাণ বাঁচাতে।




