নয়াদিল্লি: আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ভূমিকা আর শুধু বোমা ফেলা কিংবা শত্রুশিবিরে বিস্ফোরণ ঘটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রাখা, সামরিক ঘাঁটির অবস্থান চিহ্নিত করা, এমনকি শত্রুপক্ষের ড্রোন নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত রেডিয়ো সংকেত শনাক্ত করতেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চালকবিহীন এই আকাশযান। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন শুধু আক্রমণের অস্ত্র নয়, শত্রুর অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার গোপন তথ্য সংগ্রহেরও শক্তিশালী মাধ্যম।
ইউক্রেনের যুদ্ধে স্বল্পপাল্লার ড্রোন রুশ সেনার সরবরাহ ব্যবস্থা ও যোগাযোগের পথ ব্যাহত করছে। অন্য দিকে, দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি এবং সামরিক সরঞ্জাম রাখার গুদামগুলিতে হামলা চালানো হচ্ছে। এমনকি সাইবেরিয়ার মতো দূরবর্তী এলাকাতেও পৌঁছে যাচ্ছে এই সব ড্রোন। তবে সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সব ড্রোনের সঙ্গে বিস্ফোরক বা যুদ্ধাস্ত্র থাকে না। অনেক ড্রোনের কাজ হল শত্রুর অবস্থান খুঁজে বের করা এবং আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।
এই প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স’ বা SIGINT। এর মাধ্যমে বিভিন্ন রেডিয়ো তরঙ্গ ও বৈদ্যুতিন সংকেত পর্যবেক্ষণ করে শত্রুপক্ষের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরই একটি বিশেষ শাখা ‘ইলেকট্রনিক সাপোর্ট মেজারস’ বা ESM। এই প্রযুক্তির লক্ষ্য সব সময় রেডিয়ো বার্তার অর্থ উদ্ধার করা নয়। বরং কোনও সংকেত কোথা থেকে আসছে, কোন যন্ত্র সেটি পাঠাচ্ছে এবং তার অবস্থান কোথায়—তা চিহ্নিত করাই মূল উদ্দেশ্য। ফলে শত্রুর যোগাযোগের উৎস শনাক্ত করে সেখানে হামলা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এ ক্ষেত্রে ড্রোনের সুবিধা অনেক। আগে এই ধরনের নজরদারির জন্য বড় অ্যান্টেনা-সহ ভারী যান ব্যবহার করতে হত। কিন্তু ড্রোনের সাহায্যে অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব। ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ থমাস উইথিংটনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রায় ১০ মিটার উঁচু অ্যান্টেনা-সহ একটি ট্রাক থেকে যে যন্ত্রের সাহায্যে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরের সংকেত শনাক্ত করা যায়, সেই একই ধরনের রিসিভার ১,০০০ মিটার উচ্চতায় থাকা ড্রোনে বসালে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও সংকেত ধরা সম্ভব হতে পারে।
উপরন্তু, আকাশে ড্রোনের অবস্থান বদলানো যায় বলে পাহাড় বা অন্য প্রাকৃতিক বাধার কারণে তৈরি হওয়া নজরদারির অন্ধকার অঞ্চলও অনেকটা এড়ানো সম্ভব। এই প্রযুক্তি নিয়ে ইউক্রেনের গবেষণা কত দূর এগিয়েছে, তা নিয়ে কিয়েভ খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করতে নারাজ। তবে ইউরোপের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতারাও এ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে। জার্মান সংস্থা অ্যারোনিয়া সম্প্রতি ড্রোনে বসানো যায় এমন একটি SIGINT ব্যবস্থা সামনে এনেছে। সংস্থার দাবি, এই ধরনের তিনটি ড্রোন একসঙ্গে কাজ করলে ৭৫ কিলোমিটার দূর থেকেও কোনও রেডিয়ো সংকেতের উৎস ২৫ মিটারের মধ্যে চিহ্নিত করা সম্ভব।
তবে এই ব্যবস্থার একটি সমস্যা রয়েছে। যন্ত্রটির ওজন প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম। ছোট ড্রোনে এত ভারী সরঞ্জাম বহন করা কঠিন। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে আরও হালকা প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা চলছে। আমেরিকার ডেলাওয়্যার-ভিত্তিক সংস্থা স্কাই স্পাইয়ের তৈরি ‘এজেন্ট ০০১’ নামে একটি যন্ত্রের ওজন মাত্র ৫০০ গ্রাম। ছোট আকারের কোয়াডকপ্টারেও সেটি বসানো যায়। এস্তোনিয়ায় একটি পরীক্ষামূলক মহড়ায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের রেডিয়ো সংকেত শনাক্ত ও তার উৎসের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে বলে দাবি নির্মাতাদের।
শুধু সংকেতের উৎস খুঁজে বের করাই নয়, ড্রোনের ক্যামেরার সঙ্গেও এই যন্ত্রের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কোনও সন্দেহজনক সংকেত ধরা পড়লে ড্রোনটি সেই উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে এবং ছবি তুলে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পাঠাতে পারে। এতে সংকেতটি সত্যিই শত্রুপক্ষের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে আসছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হয়।
ছোট ড্রোনে এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হল তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা। রেডিয়ো তরঙ্গের বিপুল তথ্য দ্রুত পরীক্ষা করে তার মধ্যে প্রয়োজনীয় সংকেত আলাদা করতে যথেষ্ট প্রসেসিং ক্ষমতা দরকার।
অনেক সময় শত্রুপক্ষের ড্রোন নিয়ন্ত্রণের সংকেত সাধারণ ওয়াই-ফাই তরঙ্গের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে। ফলে কোন সংকেতটি সাধারণ যোগাযোগের, আর কোনটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা সহজ নয়। এই সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনা-ভিত্তিক সংস্থা এনএক্সজেনকমের তৈরি ‘বার্ন আউল’ এমনই একটি ব্যবস্থা।
সংস্থার দাবি, এই প্রযুক্তি ওয়াই-ফাই ব্যান্ডের সমস্ত সংকেত পর্যবেক্ষণ করে সেগুলির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে পারে। তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সামরিক যোগাযোগের সংকেত আলাদা করে শনাক্ত করাও সম্ভব। প্রায় ৮০০ মেগাহার্টজ বিস্তৃত রেডিয়ো তরঙ্গের পরিসর একসঙ্গে পরীক্ষা করার ক্ষমতা রয়েছে এই ব্যবস্থার। এই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একাধিক ‘বার্ন আউল’ সজ্জিত ড্রোন একসঙ্গে কাজ করবে। তারা শত্রুপক্ষের কোনও ড্রোনের সংকেত শনাক্ত করলে সেই তথ্য সরাসরি প্রতিরোধী বা ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কাছে পাঠাতে পারবে।
তার পর সংকেতের উৎসের দিকে এগিয়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করবে ইন্টারসেপ্টর। সংস্থাটির আশা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইউক্রেনে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আমেরিকার সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে দাবি নির্মাতাদের। শত্রুর ড্রোন শনাক্ত করার পাশাপাশি তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
কোনও ড্রোন কোন রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তা জানা গেলে সেই সংকেত জ্যাম করে ড্রোনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। কিন্তু এই প্রযুক্তির মোকাবিলায় পাল্টা কৌশলও তৈরি করছে সামরিক বাহিনীগুলি। এর অন্যতম উদাহরণ ফাইবার-অপটিক কেবল দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন। এই ধরনের ড্রোন আকাশে ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছনে সরু ফাইবার কেবল খুলতে থাকে।
ফলে রেডিয়ো সংকেতের উপর নির্ভর করতে হয় না। কোনও রেডিয়ো তরঙ্গ নির্গত না হওয়ায় ইলেকট্রনিক নজরদারির মাধ্যমে এগুলিকে শনাক্ত করা কঠিন। কিছু ড্রোন আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভাবে উড়তে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও প্রয়োজন হয় না।
অর্থাৎ, এক দিকে ড্রোনের মাধ্যমে শত্রুর সংকেত খুঁজে বের করার প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, অন্য দিকে সেই নজরদারি এড়াতে নতুন পদ্ধতি তৈরি করছে প্রতিপক্ষও। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক নতুন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। যে পক্ষ দ্রুত শত্রুর সংকেত শনাক্ত করতে এবং নিজের যোগাযোগব্যবস্থাকে আড়াল করতে পারবে, তারাই বাড়তি সুবিধা পাবে। শুধু আকাশে ড্রোন উড়িয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো নয়, অদৃশ্য রেডিয়ো সংকেতের লড়াইও এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম নির্ণায়ক হয়ে উঠছে।




