নিউজ ডেস্ক: ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যখন মাউরিজিও কাতেলান মিয়ামির প্রদর্শনীতে এই শিল্পকর্মটি নিয়ে আসেন, তখন এর উপাদান ছিল অত্যন্ত সাধারণ। একটি সাধারণ দোকান থেকে মাত্র ৩০ সেন্টে, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২০-২৫ টাকায় কেনা একটি কলা এবং কিছুটা রুপালি ডাক্ট টেপ। তবে প্রদর্শনীর প্রথম দিনেই এর দুটি সংস্করণ ১ লক্ষ ২০ হাজার ডলারে এবং তৃতীয় সংস্করণটি ১ লক্ষ ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়ে যায়।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন ২০২৪ সালে নিউইয়র্কের সদেবিজ নিলামঘরে এই শিল্পকর্মটির একটি সংস্করণ অবিশ্বাস্য ৬.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকায় কিনে নেন ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোক্তা জাস্টিন সান। তবে ক্রেতারা আসলে কোনও পচনশীল ফল কেনেননি; তাঁরা কিনেছেন কাতেলানের একটি ‘সার্টিফিকেট অব অথেন্টিসিটি’, অর্থাৎ সত্যতা যাচাইয়ের শংসাপত্র এবং এটি প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশাবলি। নির্দেশনায় বলা আছে, প্রতি তিন দিন অন্তর দেওয়ালে সাঁটানো কলাটি বদলে নতুন কলা লাগাতে হবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে উদ্ভট রসিকতা মনে হলেও শিল্প-ঐতিহাসিকদের মতে, কাতেলান এখানে এক সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক শিল্পধারার কৌশল ব্যবহার করেছেন। যেমন, মার্সেল দ্যুশাঁর ‘রেডিমেড’ ধারা। ১৯১৭ সালে ফরাসি শিল্পী মার্সেল দ্যুশাঁ একটি সাধারণ ইউরিনাল বা প্রস্রাবাগারকে উল্টে সেটিকে ‘ফাউন্টেন’ নাম দিয়ে শিল্পকর্ম হিসেবে প্রদর্শনীতে জমা দিয়েছিলেন। কাতেলানের কলাও মূলত সেই রেডিমেড ধারারই আধুনিক রূপ, যা প্রশ্ন তোলে—শিল্পের সংজ্ঞা আসলে কে নির্ধারণ করেন?
আসলে এটি ছিল আর্ট মার্কেটের মুখে একপ্রকার চপেটাঘাত। ১৯৯৯ সালে কাতেলান ‘এ পারফেক্ট ডে’ নামের একটি শিল্পকর্মে তাঁর মিলানের আর্ট ডিলার মাসিমো ডি কার্লোকে আক্ষরিক অর্থেই ডাক্ট টেপ দিয়ে গ্যালারির দেওয়ালে আটকে রেখেছিলেন। ঠিক ২০ বছর পর একই রুপালি টেপ ব্যবহার করে ‘কমেডিয়ান’ তৈরির মাধ্যমে তিনি আর্ট বাসেলের মতো অভিজাত ও কোটি টাকার শিল্পবাজারকে ব্যঙ্গ করেছেন। এমন এক বাজার, যেখানে ধনকুবেররা স্রেফ নিজেদের অহংকার প্রকাশের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। একই সঙ্গে এই কলা হয়ে উঠেছে গ্লোবাল ট্রেড বা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতীক। কাতেলানের গ্যালারিস্ট ইমানুয়েল পেরোটিন জানান, কলাটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতীক, হাস্যরসের চিরাচরিত উপাদান এবং একটি গভীর দ্ব্যর্থবোধক রূপক।
শিল্পের একটি ধরন হল ‘পারফরম্যান্স আর্ট’। আর সেই পারফরম্যান্স আর্টকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে অদ্ভুত সব চুরির ঘটনা। ২০১৯ সালে মিয়ামির প্রদর্শনীতেই ডেভিড দাতুনা নামের এক পারফরম্যান্স শিল্পী দেওয়াল থেকে কলাটি ছিঁড়ে খেয়ে ফেলেন এবং দাবি করেন, তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন। ২০২৩ সালে সিউলের এক জাদুঘরে দক্ষিণ কোরিয়ার এক শিল্পকলার শিক্ষার্থী একইভাবে কলাটি খেয়ে তার খোসা দেওয়ালে আটকে রাখেন। আর ২০২৪ সালে নিলামে জেতার পর স্বয়ং জাস্টিন সান সাংবাদিকদের সামনে হংকংয়ে কোটি টাকার সেই কলাটি খেয়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলেন। এমনকি ২০২৬ সালের মে মাসে ফ্রান্সের ‘সেন্টার পম্পিদু-মেৎজ’ জাদুঘরে প্রদর্শনী চলাকালীন মূল দেওয়াল থেকে কলাটি চুরির ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য হয়।
মাউরিজিও কাতেলান তাঁর এই সৃষ্টির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে সমকালীন শিল্পে বস্তু বা উপাদানের চেয়ে ‘ধারণা’ বা কনসেপ্টই সবচেয়ে মূল্যবান। কেউ এটিকে মহামূল্যবান মাস্টারপিস বলছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি স্রেফ ধনী সমাজকে বোকা বানানোর একটি আধুনিক কৌশল। তবে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, দেওয়ালে আটকে থাকা এই রুপালি ডাক্ট টেপ ও কলা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।




