ওয়াশিংটন: মহাকাশকে ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। আমেরিকা প্রথমবার প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা পৃথিবীর কক্ষপথে ‘on-orbit space control weapons’ মোতায়েন করেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন এয়ার ফোর্সের সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক এই তথ্য জানান। পরদিন মার্কিন স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল ডগলাস শিসও এই সক্ষমতার কথা নিশ্চিত করেন।
তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র কক্ষপথে রয়েছে, কতগুলি রয়েছে বা কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। মার্কিন স্পেস ফোর্স জানিয়েছে, ‘space control’ বলতে এমন একাধিক সক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মহাকাশে প্রতিপক্ষের সক্ষমতাকে ব্যাহত, দুর্বল বা প্রয়োজনে ধ্বংস করা যেতে পারে। এর মধ্যে kinetic এবং non-kinetic দুই ধরনের ব্যবস্থাই থাকতে পারে।
কী ধরনের অস্ত্র হতে পারে?
‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ শব্দটি যথেষ্ট বিস্তৃত। তাই শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা সরাসরি ধ্বংসকারী অস্ত্র বোঝায় না। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, জ্যামিং, লেজার বা অন্য ধরনের প্রযুক্তিও এর আওতায় পড়তে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য নির্দিষ্ট কোনও অস্ত্রের নাম বা প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেননি। এমনকি এগুলি আগে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, সেই তথ্যও গোপন রাখা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সক্ষমতার একটি উদ্দেশ্য হল সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা এবং মহাকাশে থাকা মার্কিন সামরিক পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখা। কারণ যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ এবং সামরিক অভিযান সব ক্ষেত্রেই উপগ্রহের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
ভারতের হাতে কি মহাকাশে অস্ত্র রয়েছে?
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। ভারত ২০১৯ সালে ‘মিশন শক্তি’-র মাধ্যমে অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা ASAT সক্ষমতা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেছে। ২৭ মার্চ ২০১৯-এ DRDO-র তৈরি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা একটি ভারতীয় উপগ্রহকে ‘hit-to-kill’ পদ্ধতিতে আঘাত করে। DRDO-র নিজস্ব প্রকাশনায় বলা হয়েছিল, এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত মহাকাশে নিজের সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
অর্থাৎ, ভারত যে উপগ্রহ-বিধ্বংসী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে, তার প্রকাশ্য প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সাম্প্রতিক ঘোষণার মতো ভারতও কক্ষপথে কোনও অস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে এমন কোনও সরকারি ঘোষণা প্রকাশ্যে নেই।
তাহলে কি শুরু হতে পারে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা?
এই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। আমেরিকার পাশাপাশি চিন ও রাশিয়াও মহাকাশে সামরিক ও কাউন্টার-স্পেস সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে একটি দেশ নতুন সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করলে অন্য দেশও পাল্টা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। এভাবেই প্রতিযোগিতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনেরও গুরুত্বপূর্ণ সীমা রয়েছে। ১৯৬৭ সালের Outer Space Treaty কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র এবং অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করে। কিন্তু প্রচলিত বা conventional অস্ত্রের ক্ষেত্রে চুক্তিটির বিধিনিষেধ একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
ফলে আমেরিকার এই ঘোষণা মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে ভবিষ্যতে মহাকাশভিত্তিক সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উপগ্রহকে সুরক্ষিত রাখতে দেশের কাউন্টার-স্পেস সক্ষমতা কতটা বাড়ানো হবে। তবে ভারতের বর্তমান কক্ষপথে মোতায়েন অস্ত্র সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য না থাকায় এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও দাবি করার সুযোগ নেই।
আমেরিকার সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে,মহাকাশ এখন শুধু গবেষণা ও যোগাযোগের ক্ষেত্র নয়, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশও হয়ে উঠেছে। সামনে বড় শক্তিগুলি কীভাবে এই নতুন সামরিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়, সেটাই এখন দেখার।