আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধের আঁচ এ বার মক্কার আকাশেও। ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কায় প্রথম বার আকাশপথে হামলার সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কা, জেড্ডা ও তাইফে সম্ভাব্য আকাশহামলার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য ‘বিপদ কেটে গিয়েছে’ জানিয়ে সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয় সৌদি সিভিল ডিফেন্স। তার মধ্যেই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোনকে ধ্বংস করা হয়েছে।
সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির দাবি, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী সেটিকে ভূপাতিত করে। সৌদি সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিট নাগাদ ঘটনাটি ঘটে। তাঁর কথায়, পবিত্র দুই মসজিদ এবং তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের কাছে ‘লাল রেখা’। হুথিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
মক্কাকে নিশানা? অভিযোগ উড়িয়ে হুথিরা
তবে সৌদির এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুথিরা। তাদের বক্তব্য, মক্কা বা কোনও ধর্মীয় স্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি। হুথি মুখপাত্র হাজেম আল-আসাদের দাবি, মক্কাকে নিশানা করার অভিযোগ ‘মিথ্যা’। ফলে ড্রোনটির নির্দিষ্ট লক্ষ্য কী ছিল, তা নিয়ে দু’পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
তবে সৌদি জোটের বক্তব্যে ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আল-মালিকি একে মক্কার দিকে হুথিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা বলে দাবি করেছেন। এর আগে 2017 সালের জুলাইয়ে মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল হুথিদের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছিল।
এক সপ্তাহে একের পর এক হামলা
মক্কায় এই নজিরবিহীন সতর্কতার আগে গত কয়েক দিন ধরেই সৌদি আরবের একাধিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে হুথিরা। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদির শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে রিয়াধের দাবি। সোমবারের হামলায় 13 জন আহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
একই সময়ে সৌদি আরবের একাধিক শহরে সতর্কতা জারি করা হয়। জেড্ডা, তাইফ, জাজান, আবহা, আল-উলা এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর ইয়ানবুতেও জরুরি সতর্কতা জারি হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় একে একে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
তেলবন্দরেও হামলার আশঙ্কা
এই সংঘাতের অভিঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে ইয়ানবু, লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর, নতুন করে নজরে এসেছে। সৌদি আরবের তেল রফতানির একটি অংশের জন্য এই বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলে হামলা বাড়লে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ বাব আল-মান্দেব প্রণালী নিয়ে। ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন লোহিত সাগর উপকূল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এটি। কাতার ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, এই জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে তার অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবও কি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র?
পশ্চিম এশিয়ার চলতি সংঘাতে তাই নতুন করে সামনে আসছে দু’টি নাম—হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব। এক দিকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা, অন্য দিকে ইয়েমেন থেকে হুথিদের হামলায় বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। দুই জলপথই আন্তর্জাতিক তেল ও পণ্য পরিবহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের মাটির আরও গভীরে হামলার পরিধি বাড়িয়েছে হুথিরা। আর মক্কার আকাশে প্রথম বার জরুরি সতর্কতা জারি হওয়ায় সংঘাতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অভিঘাতও বেড়েছে।
তবে মক্কায় হামলা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হুমকি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু পবিত্র শহরকে ঘিরে এমন সতর্কতা যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
এখন নজর তাই তিন দিকে—মক্কার আকাশ, ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্র এবং সৌদির তেল পরিকাঠামো। এই তিন জায়গায় সংঘাত আরও ছড়ালে তার অভিঘাত শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনেই আটকে থাকবে না; লোহিত সাগর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব তেল বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।