রাজনীতির ময়দানে তাঁরা পরস্পরের বিপরীত মেরুতে। কেউ ডেমোক্র্যাট, কেউ কট্টর রক্ষণশীল, কেউ আবার ‘MAGA’ শিবিরের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু গবেষণাগারে প্রাণী ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই আমেরিকার রাজনীতিতে যেন উল্টো ছবি। প্রাণীকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ব্যবহার কমানো বা বন্ধ করার দাবিতে এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। আর তাতেই নতুন করে তীব্র হয়েছে একটি পুরনো প্রশ্ন—মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে প্রাণীর উপর পরীক্ষা কতটা অপরিহার্য, আর কতটা অপ্রয়োজনীয়?
বিতর্কটি নিছক প্রাণী-অধিকারের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি অর্থ, নতুন প্রযুক্তি, ওষুধ আবিষ্কারের ভবিষ্যৎ এবং আমেরিকার বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রশ্নও। আধুনিক গবেষণায় ‘organ-on-a-chip’, organoid এবং AI-ভিত্তিক মডেলের ব্যবহার বাড়ছে। প্রাণী-গবেষণার বিরোধীদের যুক্তি, যখন মানুষের কোষ ও টিস্যু ব্যবহার করে আরও সরাসরি তথ্য পাওয়া সম্ভব, তখন প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কোথায়?
একদিকে ৫ হাজার বানর, অন্য দিকে ম্যালেরিয়ার ওষুধের সন্ধান
এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ওরেগনের Oregon National Primate Research Center। সেখানে হাজার হাজার প্রাইমেটকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যবহার করা হয়। ম্যালেরিয়া, HIV, ডিমেনশিয়া-সহ একাধিক রোগ নিয়ে গবেষণায় এই ধরনের প্রাণী ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
গবেষকদের বক্তব্য, মানুষের শরীরে কোনও নতুন ওষুধ বা টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ের আগে প্রাণীর শরীরে তার প্রতিক্রিয়া বোঝা এখনও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, একাধিক অঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পুরো শরীরে কোনও ওষুধের প্রভাব—ল্যাবের আলাদা কোষ বা কম্পিউটার মডেলে সব সময় তা পুনর্নির্মাণ করা যায় না। এই যুক্তিই এখন প্রাণী-গবেষণা বন্ধের দাবির মুখে বড় প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘প্রাণীর কষ্ট কেন?’—আন্দোলনের নৈতিক প্রশ্ন
প্রাণী-গবেষণার বিরোধীরা অবশ্য অন্য প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রাণীও যন্ত্র নয়। পরীক্ষার জন্য তাদের বন্দি রাখা, বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করা কিংবা রোগ সংক্রমিত করা নৈতিক ভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আর একটি যুক্তি—প্রাণীর শরীরের ফলাফল সব সময় মানুষের শরীরে একই ভাবে কাজ করে না। ফলে একটি পরীক্ষায় প্রাণী থেকে পাওয়া ইতিবাচক ফল শেষ পর্যন্ত মানুষের চিকিৎসায় সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই আন্দোলনকারীদের একাংশ বলছেন, গবেষণার জন্য প্রাণী ব্যবহারের বদলে সরাসরি মানবজীববিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।
ডান-বাম বিভাজন ভেঙে কেন এক মঞ্চে?
এই আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এর রাজনৈতিক চরিত্র। এত দিন প্রাণী-পরীক্ষার বিরোধিতা মূলত প্রাণী-অধিকার ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলির সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল। এখন সেই দাবিতে রক্ষণশীল মহলেরও একটি অংশ সক্রিয়। রক্ষণশীলদের যুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করদাতাদের অর্থের প্রশ্ন।
তাঁদের বক্তব্য, সরকারি অর্থে পরিচালিত গবেষণায় যদি এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যার বিকল্প প্রযুক্তি ইতিমধ্যে তৈরি হচ্ছে, তবে সেই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার যৌক্তিকতা কী? অর্থাৎ একই দাবির পিছনে দুই ভিন্ন যুক্তি—প্রগতিশীলদের কাছে প্রাণী-কল্যাণ, রক্ষণশীলদের কাছে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার। আর এই দুই স্রোতই গিয়ে মিশেছে প্রাণী-নির্ভর গবেষণা কমানোর দাবিতে।
RFK Jr-এর অবস্থানেও বদলের ইঙ্গিত
আমেরিকার স্বাস্থ্য ও মানব পরিষেবা ব্যবস্থার শীর্ষ স্তরেও প্রাণী-নির্ভর গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের একাংশ চাইছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ুক যেখানে প্রাণীর পরিবর্তে মানবকোষ, টিস্যু এবং কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করা যায়। এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি গবেষণাগারে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, প্রাণী-গবেষণায় অর্থ কমে গেলে শুধুমাত্র একটি পরীক্ষাগার নয়, বহু বছরের তৈরি গবেষণা পরিকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
AI, ‘অর্গান-অন-এ-চিপ’ কি সত্যিই বানরকে সরিয়ে দেবে?
বিতর্কের সবচেয়ে আধুনিক অধ্যায়টি প্রযুক্তি। বিজ্ঞানীরা এখন এমন ‘organ-on-a-chip’ তৈরি করছেন, যেখানে মানব অঙ্গের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপ ল্যাবের ক্ষুদ্র প্ল্যাটফর্মে অনুকরণ করা যায়। তৈরি হচ্ছে 3D organoid—মানব কোষ দিয়ে তৈরি ক্ষুদ্র, সরলীকৃত অঙ্গের মতো কাঠামো। পাশাপাশি AI ও computational modelling-এর সাহায্যে ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টাও চলছে।
প্রাণী-পরীক্ষা বন্ধের সমর্থকদের আশা, এই প্রযুক্তিগুলি আরও উন্নত হলে ভবিষ্যতে প্রাণীর প্রয়োজন নাটকীয় ভাবে কমবে। কিন্তু এখানেই বিজ্ঞানীদের পাল্টা প্রশ্ন। একটি কোষের আচরণ আর একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত শরীরের আচরণ কি এক? মানুষের শরীরে একই সঙ্গে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, লিভার, কিডনি, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা—অসংখ্য ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে কাজ করে। এই জটিল সম্পর্ক পুরোপুরি কৃত্রিম ভাবে পুনর্নির্মাণ করা এখনও কঠিন।
আমেরিকা পিছোলে চিন এগিয়ে যাবে?
বিতর্কের আরও একটি কৌশলগত দিক রয়েছে। আমেরিকায় যদি প্রাণী-নির্ভর বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় বড় কাটছাঁট হয়, অন্য দেশগুলি সেই জায়গা নিতে পারে কি না—তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চিন ইতিমধ্যেই প্রাইমেট-নির্ভর গবেষণায় বড় পরিকাঠামো তৈরি করেছে। সেখানে বানরকে ব্যবহার করে জটিল রোগ, ওষুধ এবং জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। ফলে আমেরিকার গবেষণাগারে প্রাণী ব্যবহারে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা এলে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতায় তার প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। কোভিডের সময় Covaxin-এর প্রাক্-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় rhesus macaque-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। পরে ভারতে নিজস্ব প্রাইমেট গবেষণা পরিকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো ভাবে সামনে আসে।
তাহলে কি প্রাণী-গবেষণার দিন শেষ?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। বরং আগামী দিনের বিজ্ঞান সম্ভবত একটি মধ্যপন্থার দিকে এগোবে—যেখানে যেখানে প্রাণী ছাড়াই নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা সম্ভব, সেখানে বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে; আর যেখানে এখনও বিকল্প নেই, সেখানে কঠোর নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে প্রাণী-গবেষণা চালানো হতে পারে।
কারণ প্রশ্নটি শুধু প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বনাম বিজ্ঞানের অগ্রগতি নয়। প্রশ্ন হল, মানুষের জীবন বাঁচানোর গবেষণায় কোন পদ্ধতি সবচেয়ে নির্ভুল, নিরাপদ এবং নৈতিক? আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক জোট সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। আজ যে গবেষণাগারে হাজার হাজার প্রাণী বিজ্ঞানের পরীক্ষার অংশ, আগামী দিনে হয়তো সেখানে AI, মানবকোষ এবং ‘অর্গান-অন-এ-চিপ’ জায়গা নেবে। কিন্তু সেই বদল কত দ্রুত হবে, আর তার মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হারিয়ে যাবে কি না—উত্তর এখনও বিজ্ঞানের কাছেই অমীমাংসিত।