নয়াদিল্লি: আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের আমেরিকা সফর ঘিরে কূটনৈতিক উত্তাপ। নিউ ইয়র্কে ভাগবতের সফরের আগে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি তুলেছে আমেরিকার ধর্মীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা US Commission on International Religious Freedom (USCIRF)-এর দুই কমিশনার। শুধু তাই নয়, আরএসএস নেতৃত্বের সঙ্গে আমেরিকার প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের বৈঠক না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর এই মন্তব্য ঘিরেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, USCIRF-এর এই অবস্থান ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
ভাগবতের আমেরিকা সফরের দিনক্ষণ ঘোষণার পরেই নতুন করে সামনে এসেছে এই বিতর্ক। আগামী ২৫ অগস্ট থেকে আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেন সফরে যাওয়ার কথা আরএসএস প্রধানের। নিউ ইয়র্কে ২৯ অগস্ট একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা তাঁর। প্রবাসী ভারতীয় এবং হিন্দু সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর একাধিক কর্মসূচি থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই সফরের ঠিক আগে USCIRF-এর দুই কমিশনারের মন্তব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
USCIRF-এর বক্তব্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘টার্গেটেড স্যাংশন’ বা নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা উচিত। তাদের দাবি, আরএসএস একটি বৃহৎ সংগঠন এবং তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। সেই কারণেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়টি আমেরিকার বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করছে তারা।
তবে এই অভিযোগকে সরাসরি খারিজ করেছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল USCIRF-এর মন্তব্যকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই ভারত সম্পর্কে এই সংস্থার রিপোর্ট ও মন্তব্যে একপেশে অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ভারতের বাস্তব পরিস্থিতিকে যথাযথ ভাবে তুলে না ধরে নির্দিষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ দিল্লির।
এখানেই শেষ নয়। USCIRF-এর রিপোর্ট নিয়ে ভারতের আপত্তি বহু দিনের। চলতি বছর প্রকাশিত সংস্থাটির বার্ষিক রিপোর্টেও ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক অভিযোগ করা হয়েছিল। রিপোর্টে ভারতকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক দেশগুলির তালিকায় রাখার সুপারিশের পাশাপাশি কয়েকটি ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথাও বলা হয়। ভারত অবশ্য সেই রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করেছিল।
নয়াদিল্লির যুক্তি, USCIRF কোনও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়। তাদের রিপোর্টে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্বাচন এবং ব্যবহৃত সূত্র নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে তাদের সুপারিশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না।
অন্য দিকে, USCIRF-এর বক্তব্যের পিছনে রয়েছে তাদের ঘোষিত ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত উদ্বেগ। ফলে একটি সংগঠনকে ঘিরে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। এক দিকে আমেরিকার কমিশনারদের নিষেধাজ্ঞার দাবি, অন্য দিকে ভারতের পাল্টা অভিযোগ সংস্থাটিই পক্ষপাতদুষ্ট।
এই টানাপড়েনের মধ্যেই নিউ ইয়র্কে পৌঁছবেন ভাগবত। ফলে তাঁর সফর যে শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা বলাই যায়। ভাগবতের সফরের আগে RSS-কে ঘিরে আমেরিকার এই মন্তব্য ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের পরিসরেও নতুন বিতর্কের দরজা খুলে দিল।