নয়াদিল্লি: ডাইনোসরের মতো এক দিন কি মানুষও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে? প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। গবেষকদের দাবি, বর্তমান পরিসংখ্যানগত মডেল অনুযায়ী মানবসভ্যতার অস্তিত্ব আরও প্রায় ১৭ হাজার বছর স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ, সব কিছু বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী চললে আগামী ১৭ হাজার বছরের মধ্যেই মানুষের অস্তিত্বের ইতি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নয়, কোনও ধর্মীয় ভবিষ্যৎবাণীও নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি গাণিতিক ও সম্ভাবনাতত্ত্ব-ভিত্তিক বিশ্লেষণ, যা বিজ্ঞানীদের মধ্যে বহু বছর ধরেই বিতর্কের বিষয়।
কীভাবে এল ১৭ হাজার বছরের হিসাব?
গবেষণার ভিত্তি 'ডুমসডে আর্গুমেন্ট' (Doomsday Argument) নামে পরিচিত একটি পরিসংখ্যানগত তত্ত্ব। ১৯৮০-র দশকে জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্র্যান্ডন কার্টার এই ধারণা সামনে আনেন। পরে পদার্থবিদ রিচার্ড গট-সহ একাধিক গবেষক এই তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন।
এই তত্ত্বের মূল ধারণা হল, পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মেছেন, তাঁদের ধারাবাহিকতায় আমরা এমন কোনও বিশেষ অবস্থানে নেই, যা একেবারে শুরুতে বা একেবারে শেষে। সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে মোট কত মানুষ জন্মাতে পারেন এবং মানবসভ্যতা কত দিন টিকে থাকতে পারে, তার একটি পরিসংখ্যানগত অনুমান করা হয়।
বর্তমান গবেষণায় সেই গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেই বলা হয়েছে, মানুষের সভ্যতা আরও আনুমানিক ১৭ হাজার বছর টিকে থাকতে পারে।
তা হলে কি ১৭ হাজার বছর পর নিশ্চিত ধ্বংস?
একেবারেই নয়।
গবেষকেরা নিজেরাই জানিয়েছেন, এই সময়সীমা কোনও নির্দিষ্ট 'শেষ দিন'-এর ঘোষণা নয়। এটি এমন একটি সম্ভাবনা, যা বর্তমান তথ্য, জনসংখ্যার প্রবণতা এবং সম্ভাবনাতত্ত্বের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশে বসতি স্থাপন বা অন্য কোনও বড় পরিবর্তন ঘটলে এই হিসাব সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
মানুষের সামনে কী কী বড় বিপদ?
বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ শুধু সময়ের উপর নির্ভর করছে না। বরং কয়েকটি বড় ঝুঁকি আগামী কয়েক শতাব্দীতেই মানুষের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
তার মধ্যে রয়েছে—
- জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
- পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা।
- নতুন মহামারি।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
- গ্রহাণুর আঘাত বা মহাজাগতিক বিপর্যয়।
- খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট।
- জীববৈচিত্র্যের দ্রুত বিলুপ্তি।
অন্যদিকে, আশার কথাও শোনাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যে নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রযুক্তির উন্নতি, মহাকাশে স্থায়ী বসতি, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ মানবসভ্যতার আয়ু আরও অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব বিজ্ঞানী কি এই তত্ত্ব মানছেন?
না।
'ডুমসডে আর্গুমেন্ট' নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, শুধুমাত্র সম্ভাবনার অঙ্ক কষে কোনও সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। কারণ ইতিহাসে প্রযুক্তিগত বিপ্লব, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কিংবা অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার বারবার মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে।
তাঁদের মতে, এই গবেষণাকে ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে নয়, বরং একটি 'চিন্তার খোরাক' হিসেবে দেখা উচিত।
আসল বার্তা কী?
গবেষণাটি মানুষের শেষ দিন ঘোষণা করছে না। বরং একটি প্রশ্ন সামনে রাখছে, আমরা কি এমন একটি পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, যেখানে আগামী হাজার হাজার বছর মানুষ টিকে থাকতে পারবে?
জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে যুদ্ধ, দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়— আজকের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাই ১৭ হাজার বছরের এই হিসাব যতটা না আতঙ্কের, তার চেয়ে অনেক বেশি সতর্কবার্তা। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মানুষেরই হাতে।