ভারতীয় রেলের এসি কোচে যাত্রীদের জন্য দেওয়া চাদর, কম্বল ও তোয়ালে চুরির ঘটনা রুখতে এবার কড়া পদক্ষেপের পথে কেন্দ্র। রেলের সম্পত্তি চুরির কারণে গত কয়েক বছরে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে ভারতীয় রেলকে। সেই পরিস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থাও চালু করতে চলেছে রেল মন্ত্রক। ইতিমধ্যেই রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, এসি কোচে ব্যবহৃত প্রতিটি চাদর, তোয়ালে এবং কম্বলের মধ্যে বসানো হবে অত্যাধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (RFID) চিপ। পাশাপাশি ট্রেনের এক্সিট গেট বা দরজার কাছে বসানো হবে বিশেষ ডিজিটাল সেন্সর। কোনও যাত্রী যদি রেলের বেডরোল বা তোয়ালে সঙ্গে নিয়ে ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করেন, তাহলে দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্রই সেন্সর তা শনাক্ত করবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এর ফলে রেলের সম্পত্তি চুরির ঘটনা হাতেনাতে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও কড়া করা হচ্ছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যাত্রী ট্রেন থেকে নামার আগে তাঁর জন্য বরাদ্দ বেডরোল নির্দিষ্ট রেলকর্মীর কাছে ফেরত না দিলে প্রয়োজন হলে রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (RPF) তাঁর ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিসপত্র তল্লাশি করতে পারবে। তল্লাশিতে রেলের চাদর, কম্বল বা তোয়ালে উদ্ধার হলে সরকারি সম্পত্তি চুরির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাঁকে গ্রেফতার করে জেল হেফাজতেও পাঠানো হতে পারে।
এই কঠোর সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। তথ্য অধিকার আইনের (RTI) মাধ্যমে দেশের ১৬টি রেলওয়ে জোনের ৫৪টি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ভারতীয় রেলের এসি কোচ থেকে প্রায় ১.২৭ কোটি বেডরোল, চাদর, তোয়ালে ও কম্বল চুরি হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই ধরনের চুরির ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রেল এবং বেডরোল সরবরাহকারী ঠিকাদারদের সম্মিলিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৪.৫১ কোটি টাকা।
সম্প্রতি ৫২ সপ্তাহে ৫২টি সংস্কার (‘৫২ Weeks, ৫২ Reforms’) কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরতে গিয়ে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, রেলের সম্পত্তি চুরি কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং এই প্রবণতা রুখতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে। রেল আধিকারিকরা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য দু’মাস সময় চেয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে।
রেল মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের সমস্ত রেল জোনে ধাপে ধাপে RFID-ভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল সেন্সর এবং নতুন নিরাপত্তা নির্দেশিকা কার্যকর করা হবে। যাত্রীদেরও রেলের সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি রেলের পরিষেবার মানও আরও উন্নত হবে।