নয়াদিল্লি: ভারতীয় রেলের ইতিহাসে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেল নেটওয়ার্ক এখন কার্যত সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়িত। রেল মন্ত্রকের দাবি, দেশের ব্রডগেজ রেলপথের ৯৯.৬ শতাংশে ইতিমধ্যেই বিদ্যুতায়নের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি সামান্য অংশের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। শুধু তাই নয়, নতুন রেললাইন এবং মাল্টি-ট্র্যাকিং প্রকল্পগুলি শুরু থেকেই বিদ্যুতায়িত পরিকাঠামো মাথায় রেখেই নির্মাণ করা হচ্ছে।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব লোকসভায় এই তথ্য তুলে ধরে বলেন, ভারতীয় রেল বিশ্বের দ্রুততম বিদ্যুতায়ন কর্মসূচিগুলির অন্যতম সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে যে গতি দেখা যায়নি, গত ১২ বছরে সেই কাজ হয়েছে নজিরবিহীন গতিতে।
৬০ বছরে যত, ১২ বছরে তার দ্বিগুণেরও বেশি
লোকসভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ বছরে ভারতীয় রেলের ২১,৮০১ রুট কিলোমিটার বিদ্যুতায়িত হয়েছিল। অথচ ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মাত্র ১২ বছরে আরও ৪৮,০৭২ রুট কিলোমিটার বিদ্যুতায়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
রেল মন্ত্রকের দাবি, এই গতি শুধু ভারতীয় রেলের পরিকাঠামোকেই বদলে দেয়নি, দেশের পরিবহণ ব্যবস্থাকেও আরও আধুনিক, দ্রুত এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুতায়িত রেল নেটওয়ার্ক
আন্তর্জাতিক রেল সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব রেলওয়েজ (UIC)-এর ২০২৫ সালের জুন মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৃহৎ রেল নেটওয়ার্কগুলির মধ্যে বিদ্যুতায়নের নিরিখে সুইজারল্যান্ডের পরেই ভারতের স্থান।
সুইজারল্যান্ডে ১০০ শতাংশ রেলপথ বিদ্যুতায়িত। ভারতের হার ৯৯.৬ শতাংশ। তুলনায় চিনে ৮২ শতাংশ, স্পেনে ৬৭ শতাংশ, জাপানে ৬৪ শতাংশ, ফ্রান্সে ৬০ শতাংশ এবং ব্রিটেনে মাত্র ৩৯ শতাংশ রেলপথ বিদ্যুতায়িত। এই পরিসংখ্যানকে ভারতের রেল পরিকাঠামোর দ্রুত উন্নয়নের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে কেন্দ্র।
ডিজেলের ব্যবহার কমে বিপুল সাশ্রয়
বিদ্যুতায়নের ফলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি ব্যবহারে। রেল মন্ত্রকের তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে ট্র্যাকশন কাজে ২৯৩ কোটি লিটার ডিজ়েল ব্যবহার হত। ২০২৪-২৫ সালে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি লিটারে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১৮৫ কোটি লিটার ডিজ়েল সাশ্রয় হচ্ছে। এর ফলে যেমন জ্বালানি আমদানির খরচ কমছে, তেমনই বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে।
পরিবেশের পক্ষেও বড় পদক্ষেপ
শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেছে রেল মন্ত্রক।
নীতি আয়োগের 'ফাস্ট ট্র্যাকিং ফ্রেট ইন ইন্ডিয়া' রিপোর্ট অনুযায়ী, এক টন পণ্য এক কিলোমিটার সড়কপথে পরিবহণ করলে যেখানে ১০১ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, সেখানে রেলপথে সেই নির্গমন মাত্র ১১.৫ গ্রাম। অর্থাৎ প্রায় ৮৯ শতাংশ কম। এই কারণে ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থায় ভারতীয় রেল আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছে কেন্দ্র।
সৌর ও বায়ুশক্তির উপর জোর
বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ভারতীয় রেলে ১,১৬১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ১০৩ মেগাওয়াট বায়ুশক্তি প্রকল্প চালু হয়েছে। আগামী দিনে ট্র্যাকশন বিদ্যুতের আরও বড় অংশ সৌর, বায়ু এবং হাইব্রিড নবীকরণযোগ্য শক্তি থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ ২৫ রাজ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন
রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ২৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ব্রডগেজ রেলপথের ১০০ শতাংশ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
রেলওয়ে জোনগুলির মধ্যে ইস্টার্ন রেল, সাউথ ইস্টার্ন রেল, কলকাতা মেট্রো, সেন্ট্রাল, নর্দার্ন, ওয়েস্টার্ন, ইস্ট কোস্ট-সহ মোট ১৫টি জোনে শতভাগ বিদ্যুতায়ন শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্থানে ৯৯.৮ শতাংশ, তামিলনাড়ুতে ৯৮.৩ শতাংশ, অসমে ৯৭.৯ শতাংশ, কর্নাটকে ৯৬.৮ শতাংশ এবং গোয়ায় ৯১.৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন যুগের পথে ভারতীয় রেল
রেল মন্ত্রকের দাবি, প্রায় সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়নের ফলে ভারতীয় রেল শুধু বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বিদ্যুতায়িত রেল নেটওয়ার্ক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেনি, বরং জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই গণপরিবহণ ব্যবস্থার দিকেও এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করেছে।
দেশের রেলপথে ডিজেল ইঞ্জিনের যুগ দ্রুত অতীত হচ্ছে। তার জায়গা নিচ্ছে বিদ্যুতচালিত, দ্রুতগামী ও পরিবেশবান্ধব রেলব্যবস্থা— যা আগামী দিনের ভারতীয় রেলের নতুন পরিচয় হয়ে উঠতে চলেছে।