নিউজ ডেস্ক: এক সময় বাঙালির আড্ডার পোশাক ছিল ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি; পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ধবধবে দুধ-সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি আর ধুতি। যুগের সাথে পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন। সেই সময়ে নবজাগরণের কলকাতায় ঠাকুরবাড়ির চায়ের মজলিশ থেকে শুরু করে কালীপ্রসন্ন সিংহের বৈঠকখানা, কিংবা মধুসূদন দত্তের বাড়িতে যে সব মানুষের বৈঠক জমত, তাতে শৌখিন পোশাকেই সেজেগুজে আসতেন সেকালের প্রতিভাধরেরা। মধুসূদন, ডিরোজ়িয়োর অনুগামীরা পরতেন সাহেবি কেতার পোশাকআশাক। বাকিরা পাট-ভাঙা পাঞ্জাবি, ধুতি, দামি জুতো, ছড়ি নিয়ে হাজির হতেন আড্ডা দিতে। সেই সব আড্ডা ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতির খনি। পোশাক সেখানে বিচার্য না হলেও মননের প্রকাশ ছিল তো বটেই।
বাঙালির আড্ডা নিয়ে কথা হলে চণ্ডীমণ্ডপ, নমাজ শেষের মসজিদ বা বটতলার আড্ডাও চলে আসে। এখন উচ্চবর্গীয় ক্লাবে যা হয়, সে কালের সমমনস্ক মানুষজনকে সেই একই জায়গা আর স্বাধীনতা দিত এলাকার ধর্মীয় স্থানের চত্বর কিংবা গ্রামের কোনও বড় গাছের ছায়াতল।
ষাট থেকে সত্তরের দশকে এক অদ্ভুত সাজের চল এসেছিলো। চারপাশ তখন অশান্ত। ও পারে মুক্তিযুদ্ধ এ পারে বামমনস্ক আন্দোলন। সেই সময়েও আড্ডা ছিল পুরোদস্তুর। তবে আড্ডার জন্য ভেবচিন্তে তৈরি হওয়ার চাড় ছিল না। বরং তৈরি না হওয়াটাই ছিল সেকালের ট্রেন্ড। ফ্যাশনের প্রতি তীব্র অবহেলাই ছিল ফ্যাশন। পরিপাটি সাজ পাত্তা পেত না। ফলে জন্ম নিল এক অদ্ভুত ‘ফ্যাশন বিরোধী-ফ্যাশন’। ইস্ত্রি করা শার্ট, দামি পাঞ্জাবি ব্রাত্য। বদলে আড্ডার ‘ইউনিফর্ম’ হয়ে দাঁড়ালো অবিন্যস্ত শার্ট, রং জ্বলে যাওয়া বা সিগারেটের ছাইয়ে ফুটো হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা আর পায়ে অতি সাধারণ চামড়ার চটি। যিনি যত বড় চিন্তাশীল, তাঁর পোশাক তত বেশি অগোছালো। মোটা ফ্রেমের চশমা আর অবিন্যস্ত চুলের ‘কেয়ারলেস’ সাজের আড়ালেই অনুচ্চারে বলা থাকত রীতির পরোয়া না করার কথা।
পরবর্তীতে দেখা গেল সাধারণ পাজামার উপর শার্ট বা টিশার্ট। খুব বেশি হলে আলিগড়ি পাজামার উপর বাহারহীন হাফহাতা পাঞ্জাবি। কোনও রকম দৃষ্টিসুখের ব্যাপার নেই। বরং খানিকটা ইচ্ছে করেই ‘অ্যান্টি ফ্যাশন’ হওয়া। যেন ওই অতিরিক্ত ‘কেয়ারলেস’ থাকাটাই ফ্যাশন। সে-ও সম্ভবত ছিল ভিড়ের মধ্যে আলাদা হওয়ারই এক অন্য ধরন।
সময়ের চাকা যত ঘুরেছে, নানা বদলের সঙ্গে বদলেছে আড্ডা দেওয়ার ধরনধারণ। বছর বিশেক আগেও আড্ডা দেওয়ার সেরা ঠাঁই মনে করা হত আভিজাত্যের মোড়কে মোড়া ক্লাবগুলিকে। সেই সব জায়গায় সান্ধ্য আড্ডার সাজগোজের মধ্যে থাকত এক ধরনের ‘কর্পোরেট’ আভিজাত্য বা উচ্চবিত্ত বাঙালিয়ানা। পুরুষদের পরিপাটি বুশ শার্ট বা পোলো টি-শার্ট আর মহিলাদের হালকা সিল্ক বা লিনেন শাড়ি। সে সাজে আড্ডার চেয়েও বেশি থাকত নিজের সামাজিক অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা।
এখন যদিও সেই আড্ডার ঠিকানা বদলেছে। ড্রয়িংরুম বা ক্লাবের চৌকাঠ পেরিয়ে বাঙালি এখন পুরোদস্তুর ক্যাফেমুখী। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই নব্য ক্যাফে সংস্কৃতিতে বাঙালির সাজগোজ আবার তার সেই পুরনো শৌখিনতাকে নতুন মোড়কে ফিরে পেয়েছে। এখনকার আড্ডার সাজের ব্যাকরণ হল— ‘এফর্টলেসলি স্টাইলিশ’। যেমনটা একেবারে শুরুর দিকে ছিল। পোশাক সাহেবি না বাঙালি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পোশাককে কী ভাবে বহন করছ, পোশাকের মধ্যে দিয়ে কী বলতে চাইছ, সেটাই আসল। সেই ট্রেন্ডে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন ১৮ থেকে ৬৮— সকলেই। ওভারসাইজ়ড’ শার্ট, লিনেন কো-অর্ড সেট, বোহো-চিক কুর্তা, কিউলটস-এ নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন না ৫৮-র মানুষটি। বরং নতুন আড্ডার নতুন ধারার পোশাকে নিজেকে আবিষ্কার করছেন নতুন করে।
আসলে আড্ডা মানে তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনে তার পর বাইরের পৃথিবীর চোখে আবার নিজেকে যাচাই করে দেখে নেওয়া। সেখানে নিজেকে একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে পেশ করার ইচ্ছে তো থাকবেই। তাই প্রয়োজন মতো সেই সাজ বদলে ফেলতেও দ্বিধা রাখছেন না কেউ।