অসম , নিউজ ডেস্ক: তাঁতের মাকু ছুঁয়ে গেল প্রিয় সুর,শ্রদ্ধাঞ্জলি যখন এক গ্রামীণ নারীর বেঁচে থাকার রসদ। তাঁতশালার ছন্দময় খটখট শব্দটা এতদিন ছিল কেবলই এক চিলতে উঠোনের আটপৌরে চেনা সুর কিন্তু অসমের শিবসাগর জেলার নামতি অঞ্চলের এক অখ্যাত জনপদ দিকচৌ মাউট গ্রামে সেই চেনা শব্দের বুকেই এবার বোনা হল এক নিঃশব্দ ভালোবাসার গল্প।
কোনও প্রচারের আলো চেয়ে নয়, হৃদয়ের গভীর শূন্যতা থেকেই সুতো আর রঙের খেলায় হাত দিয়েছিলেন বিউটি গগৈ। তাঁর কাছে সেই মুহূর্তটা ছিল শুধু এক প্রিয় মানুষকে শেষবারের মতো স্মরণ করা অথচ সেই চোখের জল আর সুতোর মেলবন্ধনই যে তাঁর জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেবে, তা ভাবেননি কেউই।
অসমের সুরের জাদুকর জুবিন গার্গের আকস্মিক বিদায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল রাজ্যবাসীকে। তাঁর অগণিত ভক্তের মতো বিউটিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন কিন্তু সাধারণ শোকপ্রকাশে মন ভরেনি তাঁর। নিজের প্রিয় তাঁতশালে বসে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন তিনি। লাল-সাদা সুতোয় যত্নে তুলে ধরেছেন প্রিয় শিল্পীর অমর গানের পঙক্তিগুলো। অসমীয়া সংস্কৃতির প্রাণভ্রমরা ‘গামোছা’ তাঁর হাতে হয়ে উঠেছে এক চলমান শোকগাথা এবং গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য। নিখুঁত বোনায় ফুটিয়ে তোলা সেই প্রতিটি গানের কলি আসলে ছিল একজন অনুরাগীর অকৃত্রিম নিবেদন। গামছাটি সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তা পরম শ্রদ্ধায় পৌঁছে দেন জুবিন ক্ষেত্রে, শিল্পীর স্মৃতিবেদীর উদ্দেশ্যে।
তবে গল্পের আসল বাঁকটা তৈরি হয় এর ঠিক পরেই। এই অভিনব শ্রদ্ধার্ঘ্যের খবর এবং হাতে বোনা সেই কাজটির ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। চোখের পলকে সাধারণ এক গ্রামীণ কারিগরের নিপুণ কাজ নজর কাড়ে গোটা রাজ্যের। হাজারো মানুষ আবেগাপ্লুত হন সেই দৃশ্য দেখে। সাধারণ স্মৃতিচিহ্ন থেকে শুরু করে অনুরাগীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ ,এমন গান লেখা গামছার জন্য প্রতিদিন রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করে একের পর এক বায়না।
আবেগের বশে শুরু করা সেই কাজই ধীরে ধীরে রূপ নিতে শুরু করে জীবিকার এক নতুন ঠিকানায়। প্রিয় শিল্পীর প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম কীভাবে একটি প্রান্তিক পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, দিকচৌ মাউট গ্রামের বিউটি গগৈ আজ তার এক উদাহরণ। ভালোবাসার গভীরতা সুতোর বাঁধনে বাঁধা পড়লে তা যে কেবল সম্মান নিয়ে আসে না, বেঁচে থাকার নতুন দিশাও দেখায়।




