ওয়াশিংটন, ৩ নভেম্বর: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে হামলা চালাল মার্কিন সেনা। সোমবারের এই হামলাকে আত্মরক্ষার পদক্ষেপ বলে ব্যাখ্যা করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ক্ষমতা কমাতেই ইরানের সামরিক পরিকাঠামোকে নিশানা করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের ঠিক আগে এই সামরিক অভিযান ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে। এক দিকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্য দিকে তেহরানের ভূখণ্ডে আঘাত হানছে মার্কিন বাহিনী।
কেশম দ্বীপ ইরানের বৃহত্তম দ্বীপ। হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথ হরমুজ প্রণালী। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ হওয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহণ করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানির বাজারেও।
মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, ইরানের তরফে আমেরিকার একটি সামরিক বিমানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। তার জবাবেই কেশম দ্বীপে হামলা চালানো হয়। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ছিল মার্কিন বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, মার্কিন সেনা ও সামরিক সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে অভিযানকে বড় মাপের সামরিক সংঘাতের সূচনা বলে মানতে নারাজ ট্রাম্প প্রশাসন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেশম দ্বীপে পর পর পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, বিস্ফোরণের সময় আকাশে দু’টি বিমান দেখা গিয়েছিল। দ্বীপের পাশাপাশি ইরানের উপকূলবর্তী বন্দর লেঙ্গেহ থেকেও বিস্ফোরণের খবর এসেছে। তবে হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই ঘটনার সময়কালই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকান শিবির। ইরানের সঙ্গে সংঘাত, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জ্বালানির দাম—সবই ভোটের আগে আমেরিকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ভাবে কতটা সুবিধাজনক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে ট্রাম্প একাধিক বার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে বড় কোনও সামরিক অভিযান চালানো হবে না। সোমবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেন। তাঁর দাবি, তেহরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার বার্তাই দিতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
একই সুর শোনা গিয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যেও। তাঁর দাবি, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। অন্য দিকে, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়ায় কাতার ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে বলেও দাবি তেহরানের।
কিন্তু আলোচনার পাশাপাশি সামরিক অভিযানও যে অব্যাহত রয়েছে, কেশম দ্বীপে হামলার ঘটনায় তা ফের স্পষ্ট। ফলে ওয়াশিংটনের প্রকৃত কৌশল নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। এক দিকে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত কমানোর চেষ্টা, অন্য দিকে ইরানের সামরিক পরিকাঠামোয় আঘাত—দুই পথ একসঙ্গে অনুসরণ করছে আমেরিকা।
এদিকে, ইরানকে ঘিরে ইজরায়েলের অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে। আমেরিকার নির্বাচনের পরে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান চালানোর জন্য তিনি ট্রাম্পের উপর চাপ তৈরি করছেন বলেও খবর। ফলে আমেরিকা-ইরান আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কেশম দ্বীপে হামলার প্রভাব শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। তাতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারত-সহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলির অর্থনীতিতে।
সব মিলিয়ে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে কেশম দ্বীপে হামলা ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করল। ভোটারদের কাছে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রদর্শনও করতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। এই হামলা কি সীমিত সামরিক পদক্ষেপেই আটকে থাকবে, নাকি পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের আগুন জ্বালাবে—এখন সেই দিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।




