স্পোর্টস ডেস্ক: বাইশ বছর আগের ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়রের মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল স্পেনের দ্বিতীয় ডিভিশন লিগ সেগুন্ডা ডিভিশনে এফসি অ্যান্ডোরা ও সিডি তেনেরিফের মধ্যকার ম্যাচে। ফুটবল মাঠে আবারও ফিরে এল ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়রের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি। গোলরক্ষকের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন সিডি তেনেরিফের ৩০ বছর বয়সি স্প্যানিশ স্ট্রাইকার জেসুস দে মিগুয়েল। সোমবার রাতে এফসি অ্যান্ডোরা ও সিডি তেনেরিফের মধ্যকার ম্যাচে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে, যা ২২ বছর আগে ভারতের মাঠে ঘটে যাওয়া ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়রের মৃত্যুর স্মৃতি উসকে দিয়েছে।
সোমবার রাতের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল সিডি তেনেরিফ ও এফসি অ্যান্ডোরা। ম্যাচের বয়স তখন অতিরিক্ত সময়ের সপ্তম মিনিট (৯৬ মিনিট)। খেলার ফলাফল ছিল ২-২ গোলে সমতা। তেনেরিফ নিজেদের অর্ধ থেকে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার জন্য স্ট্রাইকার জেসুস দে মিগুয়েলের উদ্দেশে একটি উঁচু ও দূরপাল্লার পাস বাড়ায়। বলটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যখন মিগুয়েল ছুটছিলেন, তখন অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনো বল আটকাতে পোস্ট ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে, প্রায় মাঝমাঠের কাছাকাছি চলে আসেন। শূন্যে থাকা বলটি ক্লিয়ার করার জন্য ওওনো লাফিয়ে ওঠার সময় তাঁর ডান হাঁটু সোজা গিয়ে আঘাত করে মিগুয়েলের বুকে। আঘাতের তীব্রতায় স্প্যানিশ স্ট্রাইকার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন। রেফারি ম্যানুয়েল অ্যাঞ্জেল পেরেজ হার্নান্দেজ সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্ডোরার গোলরক্ষককে লাল কার্ড দেখান এবং ম্যাচটি বাতিল ঘোষণা করেন।
মাঠে পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তড়িঘড়ি করে মিগুয়েলকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংঘর্ষের প্রচণ্ড আঘাতে মাঠেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল তাঁর। অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতরে চিকিৎসকদের সিপিআর-এর প্রচেষ্টায় তাঁর পালস বা হৃদ্স্পন্দন ফিরে আসে এবং তিনি নিজে থেকে শ্বাস নিতে শুরু করেন। তাঁকে সান্তা ক্রুজের লা ক্যান্ডেলেরারিয়া হাসপাতালের আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তবে মঙ্গলবার ভোররাত থেকে মিগুয়েলের স্নায়বিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে মঙ্গলবার, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর, স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ফুটবলার।
জেসুস দে মিগুয়েলের এই মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ব ফুটবলকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে ২০০৪ সালের ৫ ডিসেম্বরের সেই কালো দিনে। গোয়ার নেহরু স্টেডিয়ামে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ডেম্পো ও মোহনবাগান। ডেম্পোর হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করার মুহূর্তে মোহনবাগানের গোলরক্ষক সুব্রত পালের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় ডেম্পোর ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়রের। সুব্রত পালের আঘাত লাগে জুনিয়রের বুকে ও মাথায়। জুনিয়রও একইভাবে মাঠে লুটিয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ২২ বছর পর স্পেনের মাটিতে প্রায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
জেসুস দে মিগুয়েলের এমন আকস্মিক ও দুঃখজনক মৃত্যুতে স্প্যানিশ ফুটবল-সহ গোটা ক্রীড়াজগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তেনেরিফ ক্লাব গভীর শোক প্রকাশ করে তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, "আমরা অত্যন্ত ব্যথিত ও স্তব্ধ। আমাদের ভাষা নেই এই দুঃখ প্রকাশ করার।" অ্যান্ডোরার অন্যতম মালিক ও বার্সেলোনার প্রাক্তন ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো বড় ক্লাবগুলিও শোকবার্তা পাঠিয়েছে। এ ছাড়া উয়েফা ঘোষণা করেছে, এই সপ্তাহের সমস্ত উয়েফা টুর্নামেন্টের ম্যাচের আগে মিগুয়েলের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। এদিকে, স্প্যানিশ পুলিশ এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনোর বিরুদ্ধে 'অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা' বা ইনভলান্টারি ম্যানস্লটারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।




