স্নিগ্ধা চৌধুরী: সৃষ্টির আদিতে যখন চারিদিকে ছিল অন্ধকার, যখন আকাশ, বাতাস, জল, মাটি সবকিছু যেন অনন্ত রহস্যের মধ্যে বিলীন, তখন সেই মহাশূন্যের বুকেই জেগে উঠেছিল সৃষ্টির প্রথম সংকল্প। বৈদিক কল্পনায় সেই সংকল্পকে রূপ দেওয়ার অন্যতম মহাশক্তিই হলেন বিশ্বকর্মা। তিনি শুধু দেবতাদের শিল্পী নন, তিনি যেন সেই মহাজাগতিক স্থপতি, যাঁর চিন্তার রেখায় আঁকা হয়েছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নকশা। তাই যুগ যুগ ধরে তাঁকে বলা হয়েছে দেবশিল্পী, বিশ্বস্রষ্টা, বিধাতা এবং সমস্ত শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবশক্তি।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৮১ ও ৮২ সূক্তে বিশ্বকর্মার স্তব পাওয়া যায়। বৈদিক ঋষির কল্পনায় তিনি সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ এবং বিশ্বধাতা। তাঁর চক্ষু যেন সমস্ত দিককে প্রত্যক্ষ করে, তাঁর মন সৃষ্টির গভীরতম রহস্যকে ধারণ করে। তিনি প্রথমে মনে মনে সৃষ্টি কল্পনা করেন, তারপর সেই কল্পনাকে রূপ দেন। যেন সৃষ্টির বিশাল যজ্ঞে তিনিই ছিলেন প্রধান ঋত্বিক, আর সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছিল তাঁর নির্মাণের মহাযজ্ঞবেদী।
পুরাণের আখ্যান অবশ্য বিশ্বকর্মাকে আরও এক আশ্চর্য পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি দেবতাদের শিল্পাচার্য। দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র, মহাদেবের ত্রিশূল, শ্রীবিষ্ণুর সুদর্শন চক্র কিংবা কার্তিকেয়র দিব্য শক্তির মতো বহু মহাস্ত্রের নির্মাতা হিসেবে তাঁর নাম পৌরাণিক কাহিনিতে অমর হয়ে আছে। তাঁর কর্মশালায় সাধারণ ধাতু যেন পেত দিব্য জ্যোতি, আর তাঁর হাতের স্পর্শে জড় বস্তু হয়ে উঠত মহাশক্তির আধার।
বিশ্বকর্মার জন্ম নিয়েও রয়েছে নানা পুরাণকথা। কোনো আখ্যান অনুসারে অষ্টবসুর অন্যতম প্রভাস তাঁর পিতা এবং বৃহস্পতির ভগিনী তাঁর মাতা। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে তাঁর উৎপত্তির সঙ্গে ব্রহ্মার নাভিদেশের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। এই ভিন্ন ভিন্ন আখ্যানের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট বিশ্বকর্মা সাধারণ কোনও মানবীয় শিল্পী নন; তিনি দেবলোকে শিল্প, স্থাপত্য ও নির্মাণের এক চিরন্তন প্রতীক।
ত্রেতাযুগের স্বর্ণলঙ্কার সঙ্গে তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে মহাদেবের জন্য বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেছিলেন অপরূপ এক স্বর্ণপ্রাসাদ। প্রাসাদের দেয়াল থেকে স্তম্ভ, অট্টালিকা থেকে অলঙ্করণ সবকিছুতেই ছিল দেবশিল্পের অপূর্ব ছাপ। গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠানে রাবণ সেই প্রাসাদের ঐশ্বর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে দক্ষিণা হিসেবে স্বর্ণপ্রাসাদটিই চেয়ে বসেন। মহাদেব তাঁকে সেই প্রাসাদ দান করেন। পরবর্তীকালে সেই স্বর্ণলঙ্কাই হয়ে ওঠে লঙ্কেশ্বর রাবণের রাজ্য।
দ্বাপরযুগে বিশ্বকর্মার আরেক অমর সৃষ্টি দ্বারকা। শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে সমুদ্রের বুকের ওপর গড়ে উঠেছিল এক অপরূপ নগরী। সুবিশাল প্রাসাদ, রাজপথ, উদ্যান, অট্টালিকা,সব মিলিয়ে দ্বারকা যেন মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ দেবপুরী। পৌরাণিক কল্পনায় মনে হয়, সমুদ্রের ঢেউও যেন সেই নগরীর প্রাসাদের পাদদেশে এসে দেবশিল্পীর সৃষ্টিকে প্রণাম করত।
মহাভারতের কাহিনিতেও বিশ্বকর্মার স্থাপত্যশক্তির ছায়া রয়েছে। খাণ্ডবপ্রস্থের ভূমি রূপান্তরিত হয়ে উঠেছিল ইন্দ্রপ্রস্থে। মায়াময় সভাগৃহ, স্বচ্ছ জলের মতো মেঝে এবং মেঝের মতো প্রতিভাত জল এই অলৌকিক স্থাপত্যের বর্ণনা মহাভারতের কাহিনিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। দেবশিল্পের সেই মায়াবী জগতেই দুর্যোধনের বিভ্রান্ত হওয়ার কাহিনি আজও ভারতীয় পুরাণস্মৃতির অন্যতম পরিচিত অধ্যায়।
বিশ্বকর্মার আরাধনায় উচ্চারিত হয় তাঁর মন্ত্র। প্রণামমন্ত্রে তাঁকে মহাবীর, বিশ্বকৃত, বিশ্বধারক এবং কর্মের অধিপতি হিসেবে স্মরণ করা হয়
“ওঁ দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃক্ তঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক্।
ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।”
এই মন্ত্রের প্রতিটি শব্দের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে দেবশিল্পীর মহিমা। তিনি কর্মের ধারক, সৃষ্টির রূপকার, পরিমাপের অধিপতি এবং শিল্পের মহাগুরু। তাঁর হাতে থাকা যন্ত্র তাই শুধুই কারিগরের উপকরণ নয়; তা সৃষ্টির প্রতীক। হাতুড়ি যেন কর্মের শক্তি, পরিমাপক দণ্ড যেন শৃঙ্খলা, আর দাঁড়িপাল্লা যেন জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যের প্রতীক। তাঁর বাহন গজ শক্তি, স্থৈর্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার মূর্তিতে তাই একসঙ্গে ধরা পড়ে শিল্প, জ্ঞান, কর্ম ও সৃষ্টির মহাসংযোগ।
ভাদ্র সংক্রান্তির পবিত্র তিথিতে যখন কলকারখানা, কর্মশালা, দোকান কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিশ্বকর্মার আরাধনা হয়, তখন আসলে পূজিত হন সেই মহাশক্তি, যিনি মানুষের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে দেবত্বের সন্ধান দেন। যন্ত্রে ফুল পড়ে, কর্মের উপকরণে চন্দনের ফোঁটা লাগে, ধূপের ধোঁয়া উঠে যায় আকাশের দিকে। মনে হয়, মর্ত্যের এই ছোট্ট কর্মশালাটিও যেন এক মুহূর্তের জন্য দেবশিল্পীর স্বর্গীয় কর্মশালার অংশ হয়ে উঠেছে।
পুরাণের ভাষায় বিশ্বকর্মা তাই কেবল প্রাসাদ নির্মাণকারী কোনও দেবতা নন। তিনি সেই চিরন্তন স্রষ্টা, যিনি কল্পনাকে রূপ দেন, জ্ঞানকে কর্মে পরিণত করেন এবং কর্মকে সৌন্দর্যের মর্যাদা দেন। তাঁর হাতেই যেন সৃষ্টির প্রথম নকশা, তাঁর শিল্পেই দেবলোকের ঐশ্বর্য, আর তাঁর আশীর্বাদেই মানুষের শ্রম পায় সাফল্যের স্পর্শ। তাই বিশ্বকর্মা পুজো শুধু দেবশিল্পীর আরাধনা নয়, এটি মানুষের হাতের কাজ, মনের সৃজনশক্তি এবং সৃষ্টির প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধার এক পবিত্র উৎসব।