কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: ১৮ সেপ্টেম্বর: নাম নেই, জোড়াফুল নেই। এ বার নন্দীগ্রামে প্রার্থীও নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের! তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তের পর শুক্রবার দিনভর নাটক চলল নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ঘিরে। আর সেই নাটকের শেষ অঙ্কে মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলেন। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বৈঠক। ফলে সাক্ষাতের পরেই সঞ্চিতার প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। তবে কেন তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেন, সে বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনও ব্যাখ্যা দেননি সঞ্চিতা।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার দুপুরে। আনুমানিক ১টা নাগাদ স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নবান্নে পৌঁছন সঞ্চিতা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় তাঁর। এর আগে মমতা শিবিরের প্রার্থী হিসাবে নন্দীগ্রামে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাতের খবর প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন উঠেছিল, শেষ মুহূর্তে কি কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে চলেছে? কারণ, শনিবারই ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। তার আগের দিনই প্রার্থীর এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়ে নেয়।
সাক্ষাতের পর প্রথমে সঞ্চিতার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে বলা হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ‘আশীর্বাদ’ নিতেই তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে আসে আরও বড় খবর—মনোনয়ন প্রত্যাহার করছেন সঞ্চিতা। এর পরেই দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। যদিও সঞ্চিতা নিজে এখনও প্রকাশ্যে বলেননি, ঠিক কী কারণে তিনি ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ালেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সঞ্চিতার এই সিদ্ধান্তের ফলে নন্দীগ্রামে কালীঘাট শিবিরের নির্বাচনী সমীকরণ কার্যত আমূল বদলে গেল। কারণ, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে নতুন করে কালীঘাট শিবিরের কোনও প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে পারবেন না। অর্থাৎ, শেষ মুহূর্তে সঞ্চিতার জায়গায় অন্য কাউকে এনে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করার সুযোগও থাকছে না। এই পরিস্থিতিই ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী হিসাবে সঞ্চিতার নাম ঘোষণা হয়েছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। পেশায় স্কুলশিক্ষিকা সঞ্চিতা স্থানীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে তিনি নন্দীগ্রামে মনোনয়ন পেশ করেছিলেন। একই আসনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের প্রার্থী মহম্মদ এহতেশামুল হকও মনোনয়ন জমা দেন। ফলে একই দলের দাবিদার দুই শিবিরের দুই প্রার্থীকে ঘিরে নন্দীগ্রামের লড়াই শুরু থেকেই আলাদা মাত্রা পেয়েছিল।
তার মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশে তৃণমূলের পুরনো পরিচয় নিয়েই বড় ধাক্কা আসে। ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং সংরক্ষিত জোড়াফুল প্রতীক আপাতত কোনও পক্ষই ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানায় কমিশন। আসন্ন উপনির্বাচন পর্যন্ত দুই শিবিরকে পৃথক নাম ও প্রতীকে লড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। শুক্রবার কমিশন মমতা শিবিরকে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল পায়ে ফুটবলার’ প্রতীক দিয়েছে। ঋতব্রত শিবিরের নাম হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক ‘খাম’।
অর্থাৎ, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের নতুন নাম-প্রতীক নিয়ে লড়াই করার প্রস্তুতি ছিল। দুপুরে সেই শিবিরের প্রার্থীই পৌঁছে গেলেন শুভেন্দুর কাছে। আর তার পরেই প্রত্যাহার করলেন মনোনয়ন। ফলে নতুন নাম ও প্রতীক পাওয়ার পরেও নন্দীগ্রামে মমতা শিবির কার্যত প্রার্থীহীন হয়ে পড়ল।
ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। সেই নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী করেছে হাসিরানি রথকে। তিনি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর হয়েছে। ফলে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রচারে সেই ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্য দিকে, মমতা শিবিরের প্রার্থী সরে দাঁড়ানোয় এখন নন্দীগ্রামের লড়াইয়ের অঙ্কও বদলে গেল। ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থী মহম্মদ এহতেশামুল হক, বিজেপির হাসিরানি রথ এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা রয়েছেন ময়দানে। মমতা শিবিরের প্রার্থীর প্রত্যাহার সেই লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের আবহেই এই ঘটনা। বিধানসভা নির্বাচনের ফলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে পৃথক শিবির গড়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের নাম, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং জোড়াফুল প্রতীকের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘাত এখন নির্বাচন কমিশনের বিচারাধীন। তার মধ্যেই উপনির্বাচনের জন্য দুই শিবিরকে আলাদা নাম ও প্রতীক নিয়ে মাঠে নামতে হয়েছে।
নন্দীগ্রামে সেই লড়াইয়ের প্রথম বড় ধাক্কাটা এল মমতা শিবিরের ঘরেই। সকালে প্রার্থী নবান্নে, দুপুরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, তার পরেই মনোনয়ন প্রত্যাহার—ঘটনাপ্রবাহ এতটাই দ্রুত যে স্বাভাবিক ভাবেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। তবে সাক্ষাৎ এবং প্রত্যাহারের মধ্যে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও পক্ষ প্রকাশ্যে কিছু জানায়নি।