দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ছবি তোলার জন্য কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ানো। ঘাগরা জলপ্রপাতের কাছে তখনও পর্যটকদের ভিড়। ক্যামেরার ফ্রেমে সুন্দর মুহূর্ত ধরে রাখার ব্যস্ততার মধ্যেই আচমকা বদলে গেল পরিস্থিতি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আনন্দের মুহূর্ত পরিণত হলো উৎকণ্ঠায়। এক শিশুকে ঘিরে শুরু হল, হৈচৈ তারপরই নিখোঁজ হয়ে গেলেন পরিবারের এক সদস্য। শনিবার দুপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখনও আতঙ্ক কাটেনি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর থেকে পরিবারের সঙ্গে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির ঘাগরা জলপ্রপাত দেখতে এসেছিলেন প্রীতি দত্ত। শনিবার ৩ অক্টোবর দুপুরে জলপ্রপাতের কাছে ছবি তোলার পর ফেরার সময় আচমকাই বিপত্তি ঘটে। পরিবারের ৭ বছরের ছেলে প্রিয়ঙ্কন দত্ত হঠাৎ পা পিছলে জলের তীব্র স্রোতে পড়ে যায় বলে জানা যায়। চোখের সামনে সন্তানকে জলে স্রোতে পড়ে যেতে দেখে এক মুহূর্তও দেরি করেননি তাঁর মা প্রীতি। ছেলেকে বাঁচাতে সঙ্গে সঙ্গে জলের প্রবল স্রোতে ঝাঁপ দেন তিনি। তাঁকে দেখে তাঁর স্বামী রাজদীপ দত্তও জলে নামেন। এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দ্বারাও ছুটে আসেন। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের তৎপরতাই শেষপর্যন্ত শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় জল থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
কিন্তু, পরিস্থিতি আরও মর্মান্তিক মোড় নেয়। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই জলে স্রোতে তলিয়ে যান প্রীতি। এরপর থেকে তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বেলপাহাড়ি থানার পুলিশ। শুরু হয় নিখোঁজ মহিলার সন্ধানে তল্লাশি অভিযান। উদ্ধারকার্যে নামানো হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল, দমকল বাহিনী এবং ডুবুরি। জলপ্রপাতের বিভিন্ন অংশে চলছে তল্লাশি। বর্ষার কারণে ঘাগরা জলপ্রপাতে এখন জলের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। একইসঙ্গে রয়েছে প্রবল স্রোত এবং পিচ্ছিল পাথর। ফলে, উদ্ধারকারীদের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
উদ্ধারকারীদের অনুমান, স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে প্রীতি জলপ্রপাতের নিচের কোনও অংশে অথবা পাথরের খাঁজে আটকে থাকতে পারেন। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখে জলপ্রপাতের নিচের অংশ থেকে স্রোতের গতিপথ ধরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তবে, এখনও পর্যন্ত তাঁর কোনও হদিস মেলেনি বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে সাত বছরের প্রিয়ঙ্কনকে। কিন্তু, মায়ের কোনও খোঁজ না মেলায় শিশুটির পরিবারে এখন শুধু উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষা। যে মা তাঁর নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে সন্তানের বিপদে ছুটে গিয়েছিলেন, সেই মা এখন জলের স্রোতে তলিয়ে গিয়েছেন। এ ঘটনা যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, মা তাঁর জীবনের সবটুকু দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করে। কিছুক্ষণ আগে যে জায়গায় ছিল বেড়ানোর আনন্দ, সেখানেই এখন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে এক প্রিয়জনহারা পরিবার।
