নিউজ ডেস্ক: পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বর থেকে কলকাতায় এসে চিকিৎসকদের বিক্ষোভে যোগ দিলেন চার বছরের অরণ্য রায়ের বাবা-মা। কয়েক দিন আগেই সন্তানকে হারিয়েছেন জয়ন্ত রায় ও শিল্পী রায়। তাঁদের অভিযোগ, পূর্ব বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমে ‘ভুয়ো’ চিকিৎসকের চিকিৎসার পরই মৃত্যু হয় তাঁদের চার বছরের শিশুর। মঙ্গলবার সল্টলেকে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের দফতরের সামনে চিকিৎসকদের বিক্ষোভে যোগ দিয়ে দ্রুত তদন্ত এবং সুবিচারের দাবি জানালেন তাঁরা।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ সেপ্টেম্বর। ওই দিন অরণ্যকে ফাইমোসিসের চিকিৎসার জন্য পূর্ব বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে চিকিৎসা করেছিলেন সাইদুল হক। পরে তাঁর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ার দিনই অরণ্যের মৃত্যু হয়।
সন্তানের মৃত্যুর পর থেকেই তদন্ত এবং বিচার চেয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন বাবা-মা। মঙ্গলবার কলকাতায় এসে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে জয়ন্ত রায় দাবি করেন, ঘটনার ২৭ দিন পরেও অভিযুক্তদের সকলকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আনিসুর মণ্ডল, সুরজ আহমেদ এবং কৌশিক দত্ত-সহ তিন জন গ্রেফতার হয়েছেন। তবে চিকিৎসক-সহ আরও কয়েক জন অভিযুক্ত এখনও অধরা বলে তাঁর দাবি।
অরণ্যের মা শিল্পী রায়ের কথায়, সন্তানকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ভবিষ্যতে অন্য কোনও পরিবার যাতে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে না পড়ে, সেই কারণেই তিনি কলকাতায় এসে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। সন্তানহারা বাবা-মা বিক্ষোভস্থল থেকে বিধাননগর দক্ষিণ থানাতেও যান এবং দ্রুত তদন্তের আর্জি জানান।
এদিকে মঙ্গলবার সল্টলেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের দফতরের সামনে বিজেপিপন্থী চিকিৎসকদের একাংশ বিক্ষোভ দেখান। সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের কয়েক জন চিকিৎসকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মূল দাবি, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় এবং সহ-সভাপতি সুশান্ত রায়কে পদত্যাগ করতে হবে।
চিকিৎসকদের এই বিক্ষোভের সঙ্গে অরণ্যের মৃত্যুর ঘটনাটিও যুক্ত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রাজ্যে ভুয়ো চিকিৎসক চিহ্নিতকরণ এবং রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইতিমধ্যেই পাঁচ জন চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিলের কথা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল। তাঁদের নাম শেখ ইউনুস হাসান, উত্তম মাইতি, হাফিজুর হালদার, জুলফিকার মণ্ডল এবং সাইদুল হক। বিজ্ঞপ্তিতে জুলফিকার মণ্ডল এবং সাইদুল হকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর একই—৩৬৪৪২—বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। স্বাস্থ্যভবন সূত্রের খবর, ২০১০ সাল থেকে ভিন্রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশনের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে নাম নথিভুক্ত করা চিকিৎসকদের নথি ফের পরীক্ষা করা হচ্ছে। এমন চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ছ’হাজার বলে সূত্রের দাবি।
রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই পাঁচ জনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে ভিন্রাজ্য থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে এ রাজ্যে রেজিস্ট্রেশন করা চিকিৎসকদের নথিও খতিয়ে দেখা হবে।
অরণ্যের মৃত্যুর তদন্ত এবং ভুয়ো চিকিৎসক সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা এখন পুলিশের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে। সন্তানহারা বাবা-মায়ের একটাই দাবি দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোনও পরিবার যেন এমন শোকের মুখে না পড়ে।
