নিউজ ডেস্ক: ‘আশ্বিনা টানের দিনে, দুগ্গা ছাতুর পার্বণী/ আইসব্যে জামাই রাইত্যে, কাড়হান ছাতু দিব উয়ার পাত্যে।’- আশ্বিন মাস পড়তেই জঙ্গলমহলের গ্রামগুলিতে মুখে-মুখে ফেরে এই চেনা লোকছড়া। বাংলায় আমাদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গা পুজোর আগমন বয়ে আনে শরৎ-এর নীল আকাশ ও সাদা কাশফুল। দুর্গা মিশে আছেন বাঙালির নিত্যদিনের যাপনে। ভাদ্র-আশ্বিনে শিউলি, কাশ, ছাতিম ফুটতে আরম্ভ প্রকৃতির মাঝে আরো অনেকগুলি বার্তা থাকে যা মায়ের মর্তে আসার জানান দেয়। তার মধ্যে একটি হলো জঙ্গলমহল ও রাঢ়বঙ্গের শালবনের ছাতু যাকে শহরে আমরা বলি মাশরুম। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া এক ধরণের দুর্লভ ও সুস্বাদু বুনো মাশরুম। বর্ষার শেষে, বিশেষ করে টানা বৃষ্টির পর ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে রোদ উঠলে এই ছাতু বেশি জন্মায়। মা দুর্গার আগমনের বা পুজোর মুখে বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের শাল-পিয়ালে ঘেরা বনাঞ্চলে ফোটে বলেই এর নাম 'দুগ্গা ছাতু'। মানুষ জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনে এবং বাজারে এটি কেনার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যায় বলে একে 'কাড়ান ছাতু'ও লা হয়। বা 'পরব ছাতু'-ও বলা হয়। এর গা সাদা এবং ছাতার মতো ধার হালকা বাদামি রঙের হয়। আর এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরেই পুজোর মুখে বাড়তি উপার্জনের আশায় মুখিয়ে থাকেন এলাকার বহু মানুষ।
শরতে তেমন চাষাবাদ হয় না, তাই একটু কষ্টের দিন। তখন জামাই আপ্যায়নের মূল উপাদান হয়ে ওঠে এই দুগ্গা ছাতু। দাম বেশ চড়া। চাহিদাও প্রচুর। কিন্তু ছাতু যাঁরা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে আনেন, তাঁরা দাম পান সামান্যই। বহু আরণ্যক, অরণ্যজীবী আদিবাসীদের রুজিরুটি জোগায় ‘দুগ্গা ছাতু’। এই ছত্রাক তুললে আর্থিক লাভও হয় আবার পেটের খিদেও মেটে।
ভোর হতেই ঝুড়ি হাতে জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা বেরিয়ে পড়ছেন ছাতু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। জঙ্গলভেদে কমলা ছাতু, কান ছাতু, জীবন ছাতু, কাঠ ছাতু, শুকনা ছাতু, পিঠা ছাতু, ধুলা ছাতু কিংবা ঝিনুক ছাতুর দেখা মিললেও তার অধিকাংশ খাওয়ার উপযোগী নয়। মূলত বালি ছাতু, পুয়াল ছাতু, কুড়কুড়ি এবং দুগ্ধা ছাতুই খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে স্বাদ ও সুবাসে সবার ওপরে থাকে ‘দুগ্গাছাতু’। এই ছাতু বিক্রির জন্য ভোর থেকেই ভিড় জমছে ঝাড়গ্রাম শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।
বাংলার মাটিতে নিছক এক ‘ছত্রাক’ দেবীর নাম পেয়েছে। ভাদরের বর্ষার পর আশ্বিনের রোদে লালমাটি ভেদ করে লক্ষ লক্ষ ছাতু বেরিয়ে আসে। প্রকৃতি, বনাঞ্চল যেন ভাঁড়ারঘরের দরজা খুলে মাতৃশক্তির প্রতিরূপ হয়ে ওঠে এবং আহার ও অর্থের ব্যবস্থা করে দেয় সন্তান-সন্ততিদের জন্য।
