দেশের ‘সিলিকন ভ্যালি’। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম বড় কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মী, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ছুটছেন এই শহরের দিকে। নতুন সংস্থা তৈরি হচ্ছে, কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে। কিন্তু সেই ঝাঁ চকচকে প্রযুক্তিনগরীর আর এক ছবি বার বার সামনে আসে—অসহনীয় যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা গাড়ির সারি। এ বার সেই অভিজ্ঞতারই কথা প্রকাশ্যে এনে সরব হলেন বেঙ্গালুরুর এক প্রযুক্তি-উদ্যোক্তা। মাত্র ৩ কিলোমিটার পথ পেরোতে তাঁর লেগে গেল প্রায় দেড় ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত গাড়ি ছেড়ে হাঁটতেই হল তাঁকে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে উদ্যোক্তা সোভিক রায়ের একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিয়োর মাধ্যমে। ভিডিয়োটির শিরোনাম—‘দ্য হিডেন কস্ট অফ বিল্ডিং আ বিজনেস ইন ইন্ডিয়া, এসপেশালি বেঙ্গালুরু’। অর্থাৎ, ভারতে, বিশেষ করে বেঙ্গালুরুতে ব্যবসা তৈরি করার যে ‘অদৃশ্য খরচ’, সেটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ব্যবসার খরচ বলতে শুধু টাকা, কর্মী বা অফিসের ভাড়া বোঝায় না। প্রতিদিনের যানজটে নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়ও সেই খরচের অংশ। সোভিক জানিয়েছেন, একটি দোকানে কয়েকটি পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন তাঁরা।
পরিকল্পনা ছিল, গন্তব্যে গিয়ে জিনিসপত্র দিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসবেন। গোটা কাজ শেষ হতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু বাস্তবে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পার হতেই গাড়ি নিয়ে আটকে থাকতে হল প্রায় দেড় ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে গাড়িটি দোকানের কাছেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তার পর আর গাড়িতে নয়—হেঁটেই বাড়ির পথে রওনা দেন। সোভিকের কথায়, যানজটের পাশাপাশি রাস্তার অবস্থাও ছিল অত্যন্ত খারাপ। তাঁর অভিযোগ, রাস্তার যে অংশ দিয়ে তাঁদের যেতে হচ্ছিল, সেখানে ‘রাস্তা বলে চেনার মতোও’ প্রায় কিছু ছিল না। ফলে গাড়ি নিয়ে এগোনো যেমন কঠিন, তেমনই সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছিল।
ঘটনার পর নিজের ক্ষোভের কথা ভিডিয়োয় তুলে ধরেন সোভিক। তাঁর প্রশ্ন, ব্যবসা চালাতে গিয়ে যদি উদ্যোক্তাদের প্রতিদিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা কতটা সম্ভব? তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, এক জন উদ্যোক্তার সময়ের মূল্য রয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের বড় অংশ যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভিতর কেটে যায়, তা হলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, ব্যবসার উপরেও পড়ে। তাঁর মতে, সমস্যাটি শুধু তাঁর নয়। প্রতিদিন এই রাস্তায় চলাচল করেন ডেলিভারি কর্মী, দোকানদার, কর্মচারী এবং ক্রেতারা। তাঁদের প্রত্যেকের সময়ের উপরই যানজটের প্রভাব পড়ছে। ফলে যানজটকে শুধু ‘যাতায়াতের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি শহরের অর্থনীতি এবং কাজের গতির সঙ্গেও জড়িত। সোভিকের বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি বেঙ্গালুরুর বাইরের কেউ নন। প্রায় ১০ বছর ধরে এই শহরে বসবাস করছেন তিনি। ফলে শহরের যানজট নিয়ে তাঁর মন্তব্যকে নিছক বাইরের কারও সমালোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্ভাব্য সমালোচনার জবাবও আগেভাগে দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, কেউ যেন তাঁকে বেঙ্গালুরু ছেড়ে নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ না দেন। কারণ তিনি দীর্ঘ দিন ধরে এই শহরে রয়েছেন এবং এখনও বেঙ্গালুরুর সম্ভাবনার বিষয়ে আশাবাদী। এই জায়গাটিই তাঁর বক্তব্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
শহরের সমস্যার সমালোচনা করলেও বেঙ্গালুরু ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলছেন না তিনি। বরং তাঁর দাবি, শহরটি আরও ভাল ভাবে পরিচালিত হলে তার সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। বেঙ্গালুরুর যানজট নতুন কোনও সমস্যা নয়। দ্রুত নগরায়ণ, বিপুল সংখ্যক যানবাহন, রাস্তার সীমিত পরিসর এবং বিভিন্ন পরিকাঠামোগত কাজের কারণে শহরের বহু রাস্তায় নিয়মিত যানজট তৈরি হয়। এর আগে একাধিক প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্যোক্তা তাঁদের দৈনন্দিন যাতায়াতের অভিজ্ঞতা সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরে একই সমস্যার কথা বলেছেন। এমনকি মাত্র ৪ কিলোমিটার পথ যেতে ৪৫ মিনিট লাগার অভিজ্ঞতাও ভাইরাল হয়েছে।
বেঙ্গালুরুর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহরটির অর্থনীতির বড় অংশই সময়নির্ভর। প্রযুক্তি সংস্থা, স্টার্টআপ, ডেলিভারি পরিষেবা, ই-কমার্স, রেস্তরাঁ, খুচরো ব্যবসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত চলাচল প্রয়োজন। একটি ছোট দূরত্ব পেরোতে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে, তা হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মঘণ্টা, ডেলিভারি সময় এবং ব্যবসার খরচে। একটি গাড়ি ৩ কিলোমিটার যেতে দেড় ঘণ্টা সময় নিলে ক্ষতিটা শুধু পেট্রল বা ডিজেলের নয়। সেই গাড়িতে থাকা মানুষের কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে। ডেলিভারি কর্মীর ক্ষেত্রে আরও একটি ডেলিভারি পিছিয়ে যেতে পারে। কোনও কর্মী অফিসে পৌঁছতে দেরি করতে পারেন। কোনও ব্যবসায়ী সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে না-ও পারেন।
অর্থাৎ, যানজটের প্রতিটি মিনিটের একটি অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। সোভিকের ভিডিয়োর বক্তব্য মূলত সেই জায়গাতেই। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, একটি শহরের রাস্তা শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না। রাস্তার উপর নির্ভর করে ব্যবসার গতি, মানুষের উৎপাদনশীলতা এবং শহরের অর্থনৈতিক কার্যকলাপও। ভিডিয়োয় বেঙ্গালুরুর রাজনীতিকদের উদ্দেশেও সরাসরি বার্তা দিয়েছেন সোভিক। তাঁর আবেদন, শহরের সমস্যা নিয়ে আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হোক। রাস্তা, যানজট এবং নগর পরিকাঠামোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তবে সমালোচনার পাশাপাশি তাঁর কথায় বেঙ্গালুরুর প্রতি আস্থাও রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, এত সমস্যার পরেও তিনি শহরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। অর্থাৎ সমস্যা দেখে শহর ছেড়ে চলে যাওয়া নয়, বরং শহরটিকে আরও বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব করে তোলার দাবি তাঁর। প্রযুক্তির শহর বেঙ্গালুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ, অ্যাপ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন আলোচনা হয়। অথচ সেই শহরেই ৩ কিলোমিটার পথ যেতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একজন প্রযুক্তি-উদ্যোক্তাকে গাড়ি ছেড়ে হাঁটতে হল। সেই ছবিটিই যেন বেঙ্গালুরুর যানজটের সবচেয়ে বড় প্রতীক। এক দিকে প্রযুক্তির দৌড়ে শহরটি দেশের শীর্ষে।
অন্য দিকে, শহরের রাস্তায় তিন কিলোমিটারের পথও কখনও কখনও হয়ে উঠছে দেড় ঘণ্টার পরীক্ষা। সোভিক রায়ের প্রশ্ন তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রশ্ন নয়, যে শহর সারা পৃথিবীর ডিজিটাল ভবিষ্যৎ তৈরি করছে, সেই শহর কি নিজের রাস্তায় চলার মতো ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন বেঙ্গালুরুর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।